দক্ষিণাঞ্চলে সাড়ে চার মাসে ৭০ হত্যাকাণ্ড

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২২:১১
দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। চলতি বছরের মাত্র সাড়ে ৪ মাসে ৭০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতি মাসে ১৫টি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিভাগের ৬ জেলায় ৬৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আর নতুন বছরের সাড়ে ৪ মাসেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭০ জনেরও বেশি। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বেড়েছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগসহ অপর ৫ জেলার সিভিল সার্জন অফিসের চিকিত্সকদের ময়না তদন্ত রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৪ মে পর্যন্ত ৭০টি’র বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৩ জন পুরুষ, ২৪ জন নারী ও ৫ জন শিশু। সর্বাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বরিশাল জেলা ও মহানগরীতে। জেলা ও মেট্টোপলিটন এলাকা মিলিয়ে বরিশালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২৩ জন। এছাড়া ভোলা জেলায় ১২ জন, পটুয়াখালীতে ১৩ জন, পিরোজপুরে ৮টি, বরগুনায় ৭টি ও ঝালকাঠীতে ৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে। এছাড়া প্রেম, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। খুনের ঘটনা সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে সর্বাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ফেব্রুয়ারি মাসে। ঐ মাসে ১৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারি মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৭টি। মার্চ মাসে ৯টি। এপ্রিল মাসে ৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া চলতি মাসের গত ১৪ দিনে ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অথচ গত বছর (২০১৩ সালে) পুরো বিভাগে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ৬৭টি। হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৪জন পুরুষ ও ২৩ জন নারী ছিল। নিহত ৮ জনের লাশ নদী থেকে উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হয়। তাদের পরিচয় মিলেনি। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধের মাত্রাও বেড়েছে চলতি বছরে। অথচ গত বছর রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল খুবই সন্তোষজনক। দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবসান ঘটার পর কেন এ অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এমন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে। বিশিষ্ট নাগরিকরা মনে করেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দীর্ঘ দিনেই রদবদল না করায় এ বাহিনীতে কাজের গতি নেই। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কোথাও শূন্য আবার কোথাও অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ রেঞ্জে ডিআইজি নেই। মেট্রোপলিটনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পদটি বছরের পর বছর শূন্য পড়ে আছে। উপ-পুলিশ কমিশনারের ৪টি পদের মধ্যে একটি পদ জন্মলগ্ন থেকেই শূন্য থেকে আসছে। ২০ জন এসি’র মধ্যে কাগজে-কলমে আছেন ১৭ জন। বাস্তবে আছেন ৪ জন। বাকিরা কেউ মিশনে কিংবা প্রশিক্ষণে অথবা লম্বা ছুটিতে রয়েছেন। কর্মকর্তা না থাকায় মাঠ পর্যায়েও বেহালদশা। মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল নেই। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠিত হয়েছিল এক হাজার ২২৮ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে। আজও একই জনবল নিয়ে চলছে মহানগর পুলিশ। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠিত হয়েছে বরিশালের পর। সেখানে দু’ দফা জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের জনবল বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে অথচ বরিশাল মেট্রোপলিটনে জনবল বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোঃ শামসুদ্দিন জানান, জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব আরো বহু আগে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঐ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে বছরের পর বছর পড়ে আছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কথা অস্বীকার করে ডিআইজি’র দায়িত্বে থাকা পুলিশ কমিশনার জানান, স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা কিংবা পারিবারিক কলহ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশে খুন হওয়ার ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি নয়। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে কোনো রাজনৈতিক হানাহানি নেই। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্ন সৃষ্টি করার মত কোনো পরিবেশ নেই। তার মতে, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সন্তোষজনক।