মাদাম কুরি প্রথমে একজন বিজ্ঞানী, তারপর একজন নারী—নাকি, প্রথমে নারী তারপর বিজ্ঞানী বলা কঠিন। বিজ্ঞানের জগতে তার অবদান বিচার করলে তাকে আইনস্টাইনের পাশাপাশি স্থান দেওয়া যায়। জীবন ব্যয় করেছেন বিজ্ঞানের গবেষণায়। তারপরও মানুষ হিসেবে, বিশেষ করে পুরোনো পৃথিবীর একজন নারী হিসেবে তার জীবন কাহিনী রূপকথাকেও হার মানায়। মারি কুরি বা মারিয়া স্কদ্ভস্কা কুরি হলেন প্রথম নারী বিজ্ঞানী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তার জন্ম এক পরাধীন দেশে। পোল্যান্ড তখন রাশিয়ার দখলে। ভাষাগত আর অর্থগত অর্থেই শোষিত জাতি তখন পোলিশরা। এমনি এক সময়ে, ১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর, পোল্যান্ডের রাজধানী ভার্সাভাতে জন্ম নেন তিনি। নাম রাখা হয় ‘মারি স্কদ্ভস্কা’ পদার্থবিদ্যা আর গণিতের প্রফেসর পিতা ভাদিসভ স্কদ্ভস্কি আর পিয়ানোবাদক ও গায়িকা স্কুল-টিচার মা ব্রনিসভা তার পাঁচ সন্তানকে নিয়ে গড়েছিলেন ছোট্ট সংসার। মারিয়া ছিলেন সবার ছোট। মারি কুরি ওয়ার্সার গোপন ভাসমান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং ওয়ার্সাতেই তার ব্যবহারিক বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন। ১৮৯১ সালে ২৪ বছর বয়সে তিনি তার বড় বোন ব্রোনিস্লাভাকে অনুসরণ করে প্যারিসে পড়তে যান। সেখানেই তিনি তার পরবর্তী বৈজ্ঞানিক কাজ পরিচালিত করেছিলেন। ১৯০৩ সালে মারি কুরি তার স্বামী পিয়েরে কুরি এবং পদার্থবিদ হেনরি বেকেরেলের সাথে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার জেতেন। সে ১৯১১ সালে রসায়নেও নোবেল পুরস্কার জেতেন মারি কুরি । আবিষ্কারের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কৃত হলেও এর প্রকৃতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা তখনও ছিল অজানা। স্বামীর পরামর্শে স্কদ্ভস্কা কুরী ইউরেনিয়াম রশ্মির উপর গবেষণাকেই নিজের থিসিস হিসাবে গ্রহণ করলেন। স্বামী পিয়েরে কুরী তার ভাইকে সাথে নিয়ে পনের বছর আগে তড়িত্ চার্জ মাপার যন্ত্র ইলেক্ট্রোমিটার আবিষ্কার করেছিলেন। মারিয়া, ইউরেনিয়াম খনিজের মধ্যে তড়িত্ চার্জের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা চালালেন। তিনি আবিষ্কার করলেন, খনিজের চারপাশে চার্জের অস্তিত্ব আছে। এবং এই চার্জের পরিমাণ কেবল খনিজে ইউরেনিয়াম পরমাণুর পরিমাণের উপর নির্ভর করে। বিস্তর গবেষণা করে মারিয়া কুরি এ সিদ্ধান্তে আসেন যে, ইউরেনিয়াম খনিজে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে এ বিকিরণ হচ্ছে না। বরং তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়াম পরমাণুরই নিজস্ব ধর্ম। তেজস্ক্রিয়তার গবেষণায় এটা ছিল এক বিরাট আবিষ্কার। ভবিষ্যত্ আধুনিক পদার্থবিদ্যার দরোজা এ আবিষ্কারই খুলে দিয়েছিল। এটি ছিল তার প্রথম মৌলিক আবিষ্কার। আর একজন নারী হিসাবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি অতুলনীয়। মারি কুরি ৬৬ বছর বেঁচে ছিলেন। ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই তিনি ফ্রান্সে মৃত্যুবরণ করেন।
