বইয়ের নানা রঙিন হাতে আঁকা ছবিগুলো দেখে দেখে ছবি আঁকা। প্রথম শুরু এভাবেই। পরিচয় ঘটে রংতুলির সাথে। কিন্তু রংতুলি থেকেও তাকে বই বেশি টানতো। বইয়ের মধ্যে পড়ার পাশাপাশি নানা ছবি দেখে আঁকতে ইচ্ছা হতো এবং ভালোলাগা থেকেই শুরু করলেন আঁকাআঁকি। এই যে শুরু এরপর আর কখনও থেমে থাকেননি। নিজের প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এখন দেশসেরা ও সারা বিশ্বনন্দিত আঁকিয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় চিত্রশিল্পী, প্রচ্ছদশিল্পী, বই নকশাকার, পোস্টার ডিজাইনার, শিশু সংগঠক ও লেখক হাশেম খান। তার শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্যের গল্প জানাচ্ছেন আহসান রনি
বেড়ে ওঠা সবুজে ঘেরা, শান্ত পরিবেশের সেকদি গ্রামে। চাঁদপুরের ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে মেঘনা নদী। নদী পাশে থাকার কারণে গ্রামটির সৌন্দর্য ছিল মোহনীয়। ঠিক যেন কোনো কবিতায় বর্ণনা করা রূপবতী কোনো গ্রাম। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বাবার শান্ত ছেলেটি এই সৌন্দর্যকে উপভোগ করত। নিজের মনে ছবি আঁকত। তবে ছেলেটির ছবি আঁকার থেকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল বেশি। সারাদিন বই পড়েও তার ক্লান্তি নেই। গ্রামের কৃষকপুত্রদের সাথে বেড়ে উঠেছেন বলে হয়তো প্রকৃতি সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ সকলকে হার মানাতো। বাবার চাকরির কারণে যখন চাঁদপুর শহরে এলেন তখন পেয়ে গেলেন নিজের স্বর্গক্ষেত্র। চাঁদপুরের হাসান আলী হাই স্কুলে ভর্তি হন। সেই স্কুলের লাইব্রেরি ছিল নানা ধরনের বই, ম্যাগাজিন ও জার্নালে ভরপুর। ছেলেটি যেন খুঁজে পেল তার আদর্শ স্থান। নাওয়া-খাওয়ার চেয়ে তার কাছে লাইব্রেরিতে কোনো নতুন বই পড়া ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এত বই পড়তেন যে সকলে তাকে তার বই পড়ার কারণেই বেশি চিনত। তার বইপড়ুয়া হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন তার প্রিয় শিক্ষক সুরেশচন্দ্র চক্রবর্ত্তী। তিনি হয়তো অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তার ছাত্র একসময় নতুন কিছু করে দেখাবে। শিক্ষক হিসাবে তিনি ছিলেন একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। তিনি পড়াতেন। গল্প করতেন। ছাত্রদের ছিলেন খুব ভালো বন্ধু। তিনি নিজে ছাত্রদের ভালো ভালো বই দিতেন আর ছাত্রদের কাছ থেকে বই নিতেনও। হাশেম খানের বইপ্রীতি দেখে তিনি খুবই খুশি হলেন। তিনি একদিন তাকে বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ বইটি দিলেন। বিনিময়ে একটি বই চাইলে ছোট্ট হাশেম একটি গোয়েন্দা বই দিয়েছিলেন শিক্ষককে। দেওয়ার সময় নিজেও লজ্জা পেয়েছেন। সেই সময় তিনি সব ধরনের বই পড়তে থাকলেন। মাঝে মাঝে ছবিও আঁকতেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে কামার, কুমারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের নানা জিনিস বানানো দেখতেন আর মুগ্ধ হতেন। গ্রামের পশুপাখি, প্রজাপতির রং শৈশবে হাশেম খানকে আপ্লুত করত। তিনি বইয়ে বিভিন্ন ছবি দেখতে পছন্দ করতেন। ভাই সুলেমানকে নিয়ে তিনি সেই ছবির নকল করতেন। সেই থেকেই শুরু আঁকাআঁকি। বইয়ের অসাধারণ ছবিগুলো দেখে তিনি বিশ্বাস করতে পারতেন না, সেগুলো আসলেই সত্যি। বাড়ির কেউ তেমন কিছু বলত না বলে আঁকাআঁকি ছাড়েননি। তিনি প্রতিদিন খেয়াল করতেন তাদের বাড়িতে এক লোক মাঠা বিক্রি করতে আসে। তার আসার ভঙ্গিটা খুব ভালো লাগত ছোট্ট হাশেমের। একদিন নিজের মনে মাধুরী মিশিয়ে একে ফেললেন মাঠা বিক্রেতার ছবি। তত্কালীন সময়ে কোনো এক পত্রিকার উদ্যোগে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ছবিটা পাঠালেন তিনি। একদিন চিঠি এলো তার নামে। প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। নিজের প্রথম পুরস্কার তাই অনেক আগ্রহ পেয়ে গেলেন আঁকার প্রতি। পরীক্ষায় রেজাল্ট করলেন মাঝামাঝি। তাই বাবা-মা ছেলের আঁকার প্রতি আগ্রহ এবং তার ভাই ও ভগ্নিপতির পরামর্শে ভর্তি করিয়ে দিলেন তত্কালীন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে। বর্তমানে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট। এরপর আর কোনো পিছুটান নেই। পড়তেন আর আঁকতেন। ১৯৬১ সালে চিত্রকলায় প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং বর্তমানেও কর্মরত আছেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান অলঙ্করণের প্রধান শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলার দায়িত্ব নিয়ে কলকাতা, দিল্লি ও মুম্বাইয়ে প্রদর্শনী করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রশিক্ষণ কর্মশালায়। ১৯৬২-১৯৯৫ মোট ১৫ বার বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র কর্তৃক বইয়ের ছবি আঁকার (প্রচ্ছদ ও ইলাস্ট্রেশন) শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে লাইপজিগ আন্তর্জাতিক বই মেলায় তার আঁকা বই পুরস্কৃত হয়। ১৯৮৮ ও ১৯৯৩ সালে শিশু সাহিত্যে অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে চাঁদপুর ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, ১৯৯১ সালে বঙ্গবন্ধু পুরস্কার এবং ১৯৯২ সালে জাতীয় সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। তার মহত্ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে হাশেম খানকে বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করে। স্ত্রী পারভীন হাশেম, কন্যা কনক খান রিয়াজ, পুত্র শান্তনু খান ও জামাতা রিয়াজ আহমেদকে নিয়ে হাশেম খানের ছোট্ট ও সুখী পরিবার।
তরুণদের মধ্যে যারা আঁকতে চায় তাদেরকে বেশি বেশি বই পড়ার পরামর্শ দিলেন এই দেশসেরা চিত্রশিল্পী। তার মতে, একজন চিত্রশিল্পীর অন্যতম প্রধান গুণ হচ্ছে সাহিত্যে দখল থাকা। রাজনীতি থেকে শুরু করে সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা একজন চিত্রশিল্পীর অন্যতম দায়িত্ব। চারদিক থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। চারপাশের খবর সম্পর্কে যেসব শিল্পী খোঁজখবর রাখেন না, তিনি আসলে প্রকৃত শিল্পী নন। এ রকমই জানালেন হাশেম খান। তিনি এমন একটি তারুণ্য যে তারুণ্য হবে পড়ুয়া ও জ্ঞানী। হাশেম খান জানালেন, একজন সেরা চিত্রশিল্পী হওয়ার মূল সূত্র হলো—পড় এবং পড়।
