ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র বিশাল নির্বাচন জয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কি? আমার কাছে লন্ডনের কোনো কোনো বিদেশি বন্ধু জানতে চেয়েছেন। আমি তাদের বলেছি, প্রতিক্রিয়াটি মিশ্র, বিএনপি ও জামায়াত মহলে উল্লাস এবং আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী শিবিরে কিছুটা হতাশা। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের বক্তব্যে এই উল্লাসটা চাপা নেই। বিএনপির পক্ষ থেকেতো ইতিমধ্যে বলাই হয়েছে, ‘ভারতের সঙ্গে (আসলে বিজেপি সরকারের সঙ্গে) তারা সহযোগিতা করে চলতে চান। ভারতের সঙ্গে কোনো বিরোধ জিইয়ে রাখতে তারা চান না’।
এই বক্তব্যটির সরলার্থ কি তা তারা ব্যাখ্যা করেননি। দিল্লির কংগ্রেস সরকারের মতো তিস্তায় পানিসহ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সকল সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে বিজেপি সরকারও ঢিলেমি করলে বিএনপি ও জামায়াত কি সেই সরকারের সঙ্গে গলাগলি করবেন? এবং তারা এই কাজটি করবেন এই আশায় যে, বিজেপির নরেন মোদী সরকার বাংলাদেশের স্বার্থ ও অধিকারের বিরুদ্ধে কাজ করলেও ক্ষতি নেই। কেবল আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি মনমোহন সরকারের মতো পক্ষপাতিত্ব না দেখালেই চলবে। অর্থাত্ জাতীয় স্বার্থে নয়, দলীয় স্বার্থে বিএনপি ও জামায়াত এখন ভারত-প্রীতি দেখাবে!
বিএনপি ও জামায়াতের এই আশাবাদ পূর্ণ হবে—তা মনে হয় না। অন্যদিকে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারেরও বেশি শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে সতর্ক হওয়ার রয়েছে। নরেন্দ্রনাথ দামোদর দাস মোদীর নির্বাচন-বিজয়ের আগের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে, তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার সম্পর্কে নয়, গোটা বাংলাদেশ সম্পর্কেই বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তিনি ক্ষমতায় এলে ভারত থেকে বহিরাগত বাংলাদেশিদের ঝেটিতে বিদায় করবেন বলে বার বার হুমকি দিয়েছেন।
লক্ষ্য করার বিষয়, নরেন্দ্র মোদী তার নির্বাচন প্রচার অভিযানে বাংলাদেশ ও চীন সম্পর্কে যতোটা কঠোর মন্তব্য করেছেন, পাকিস্তান সম্পর্কে ততোটা মোটেই করেননি। একদিকে ভারতের চির বৈরি পাকিস্তান সম্পর্কে মোদীর এই নমনীয় মনোভাবের এবং অন্যদিকে মোদী নির্বাচিত হওয়ার আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ কর্তৃক নির্বাচনে মোদীর বিজয় কামনা করে তাকে সমর্থন দানের ঘোষণার মধ্যে কোনো ধরনের সম্পর্ক রয়েছে কিনা দিল্লির এক শ্রেণীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক তাও এখন খতিয়ে দেখছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, মোদী কি তাহলে পাকিস্তান সম্পর্কে বিজেপির পূর্বতন বাজপেয়ী সরকারের নীতি অনুসরণ করবেন? অতীতে বাজপেয়ী ক্ষমতায় বসেই পাকিস্তানের প্রতি মৈত্রীর বাণী মুখে লাহোরে ছুটে গিয়েছিলেন এবং দিল্লি ও লাহোরের মধ্যে সরাসরি বাস সার্ভিস প্রবর্তন করে তিনি প্রথম লাহোরগামী বাসটিতেই নিজে যাত্রী হয়েছিলেন। তখনও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফই। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান এই প্রেম বিনিময় ব্যর্থ হয় কারগিল যুদ্ধে। নরেন্দ্র মোদী কি তার পূর্বসূরী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সেই ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্টের দিকে আবার আগাবেন?
এই ব্যাপারে ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে মতদ্বৈধতা আছে। একদল বলছেন, পাকিস্তানের বিরাট অর্থনৈতিক বাজারের দিকে ভারতের বিগ কর্পোরেট সওদাগরদের নজর বহু দিনের। তারা চায় না এই বিরাট বাজারটি চীনের দখলে থাকুক এবং সেই সঙ্গে সামরিক প্রভাবও। তাদের চাপেই বাজপেয়ী পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তত:যোগাযোগ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা স্থাপনে এগিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রকৃত শাসক সামরিক চক্র ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের চক্রান্তে বাজপেয়ী মিশন ব্যর্থ হয়।
এবারে নরেন্দ্র নাথ মোদী কি বাজপেয়ী মিশনের ব্যর্থতার কথা জেনেও তার অনুসরণ করতে চাইবেন, না তার সরকার কোনো নতুন কৌশল গ্রহণ করবেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের এক অংশের ধারণা, তিনি পাকিস্তানকে চীনের প্রভাবমুক্ত করার জন্য বাজপেয়ীর অনুরূপ কোনো নতুন কৌশল গ্রহণ করবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অন্য অংশের ধারণা মোদী তা করবেন না। অটল বিহারী বাজপেয়ী ধর্মান্ধ এবং উগ্র সঙ্ঘ পরিবারের সদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিজেপির উদার নৈতিক অংশের নেতা। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদী সঙ্ঘ পরিবারের সদস্য এবং মনোনীত প্রধানমন্ত্রী।
বিজেপির এই সঙ্ঘ পরিবারে রয়েছে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত আর, এস,এস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ) শিবসেনা ও বিশ্ব হিন্দু সভা ইত্যাদি। ভারতের এবারের নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে বিজেপি ক্ষমতায় আসেনি; এসেছে সঙ্ঘ পরিবার। তাদের নির্দেশেই নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনের আগেই দলে এল কে আদভানী, যশোবন্ত সিং প্রমুখ বর্তমানের উদারপন্থীদের কোণঠাসা করে ফেলেন এবং চারপাশে কট্টরপন্থীদের স্থান দেন। বর্তমানেও মন্ত্রিসভা গঠনে তিনি আর, এস, এসে’র পরামর্শই গ্রহণ করছেন বলে জানা গেছে।
ভারতে তাই প্রকৃতপক্ষে বিজেপি নয়, কট্টরপন্থী সঙ্ঘপরিবার ক্ষমতায় এসেছে বলা চলে। তাতে বাংলাদেশের কট্টরপন্থীরা খুশি হতে পারেন। কিন্তু তাদের এই খুশি খুশি ভাবটা বেশিদিন থাকবে কি? ভারতের উগ্রপন্থীরা বাংলাদেশেও উগ্রপন্থীদের ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য জোগাবে কি? বিশ্বের ইতিহাসে তার উদাহরণ বিরল। বিশ্বের প্রথম শক্তিশালী কম্যুনিষ্ট রাষ্ট্র ছিল সোভিয়েট ইউনিয়ন। দ্বিতীয় শক্তিশালী কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে চীনের অভ্যুদয় হতেই দেখা গেল এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সদ্ভাব ও সহযোগিতা নয়, বিপজ্জনক বিবাদের সূত্রপাত হয়েছে। এই বিবাদের জেরে সাম্যবাদী চীন ধনবাদী আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছিল।
ভারতের নরেন্দ্রনাথ মোদী যতোই কট্টরপন্থী হোন, তিনি কি চাইবেন প্রতিবেশী বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদিস্টরা অথবা তাদের সমর্থক ও সহযোগীরা ক্ষমতায় বসুক এবং ভারতে সন্ত্রাসী তত্পরতা আরো বেড়ে উঠুক? পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠুক? ক্ষমতায় বসে ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্য এই বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে। তিনি এখন যতোই ভারত থেকে বাংলাদেশি বিতাড়নের হুঙ্কার দিন, তাকে হয়তো ভারতের স্বার্থ ও নিরাপত্তার স্বার্থেই বাংলাদেশে একটি সেক্যুলার সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে এবং ভারতের বন্ধু রাখতে সাহায্য যোগাতে হবে। বিএনপি-জামায়াতকে তখন হয়তো কংগ্রেস সরকারের আমলের মতো বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলেও ভারত বিরোধিতার তাসটি খেলতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী সরকারের কেউ কেউ আমাকে বলেছেন, ভারতে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসায় তারা খুব চিন্তিত নন, অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক আগের মতো না থাকুক, তার যে বিপজ্জনক অবনতি ঘটবে না এ সম্পর্কে তারা আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সম্পর্কেও তারা আস্থাবান। অতীতেও বাজপেয়ী সরকারের বৈরিতার মুখে তখনকার হাসিনা সরকার পড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। এমনকি বিএনপি সমর্থক এক বিডিআর প্রধান সীমান্তে ভারতীয় জওয়ান হত্যা এবং তাদের মৃতদেহ ঝুলিয়ে প্রদর্শন করে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লীকে ক্ষেপিয়ে তোলার চক্রান্ত করেছিল। সঙ্কটে শেখ হাসিনা স্থির বুদ্ধি ও ধৈর্যের পরিচয় দেন। তখনকার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে সরাসরি টেলিফোন করে আলাপের মাধ্যমে তিনি সেই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠেন।
এবারেও দেখা গেছে, নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হতেই তার জনপ্রিয়তা দেখে শেখ হাসিনার নির্দেশে দিল্লীতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোদীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এই সাক্ষাত্কার বাংলাদেশের আওয়ামী সরকার সম্পর্কে নরেন্দ্র মোদীর মনোভাব কতোটা প্রভাবিত করেছে তা সঙ্গে সঙ্গে জানা না গেলেও অদূর ভবিষ্যতে অবশ্যই জানা যাবে। বাজপেয়ী সরকারের মতো নরেন্দ্র মোদী সরকারের সঙ্গেও শেখ হাসিনা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি সমঝোতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন, এটা আশা করা যায়।
তবে বাজপেয়ীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক চরিত্রের পার্থক্যটি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। আগেই লিখেছি, বাজপেয়ী সঙ্ঘপরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিজেপির উদার অংশের নেতা। নরেন্দ্র মোদী সঙ্ঘপরিবারের সদস্য এবং তাদের দ্বারা মনোনীত প্রধানমন্ত্রী। এজন্যই বলা চলে ভারতে এবার কার্যত বিজেপি ক্ষমতায় আসেনি। ক্ষমতায় এসেছে সঙ্ঘ পরিবার। তাদের উগ্র হিন্দুত্ববাদ ভারতের গণতন্ত্রের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় কিনা তা এখনো দেখার রয়েছে। অনেকের আশা, ভারতের সেক্যুলার এস্টাবলিসমেন্ট এতোটা দৃঢ়মূল যে, তারা এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠবে। এটা ভারতের ছোট-বড় প্রতিবেশীদেরও আশা। তথাপি এই ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিশেষ করে বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশে বিএনপি সাম্প্রদায়িকতামনা দল হওয়া সত্ত্বেও প্রথম যখন (১৯৯১) এককভাবে ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি হয়নি। বরং বিএনপি দলটির গণতন্ত্রায়ন ঘটেছিল। দেশে উগ্র মৌলবাদের অভ্যুদয়ে বিএনপি সরকার তেমন কোনো সাহায্য যোগাননি; বরং গোলাম আজমের নাগরিকত্বের মামলায় তাকে গ্রেফতার করারও সাহস দেখিয়েছিলেন। গোল বাঁধে দ্বিতীয় দফায় জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় বসার পর। এই সরকার কার্যত জামায়াত সরকার হয়ে ওঠে। প্রশাসনে শুরু হয় নির্লজ্জ জামায়াতিকরণ। জঙ্গি মৌলবাদের উত্থান ঘটে। উত্থান ঘটে বাংলা ভাইদের। পাকিস্তানের আইএসআই তাদের চক্রান্তের জাল বিস্তার করে সারা দেশে। বড় বড় রাজনৈতিক হত্যা ও সন্ত্রাসে দেশ ভরে গিয়েছিল।
ভারতেও বর্তমানে বিজেপি নয়, বিজেপির সাইনবোর্ডের আড়ালে আরএসএস তথা সঙ্ঘপরিবার ক্ষমতায় বসেছে। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা, সেখানে রামমন্দির তৈরি, ভারত থেকে বাংলাদেশি ছাপ মেরে মুসলমান বিতাড়ন তাদের ঘোষিত এজেন্ডা। নরেন্দ্র নাথ দামোদর মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে এই কট্টরপন্থীদের রাশ কতোটা টেনে ধরতে পারবেন এবং ভারতে অর্ধশতকেরও বেশি সময়ের গণতান্ত্রিক শাসনের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা কতোটা ধরে রাখতে পারবেন, তার উপর শুধু ভারতের নয়, এই উপমহাদেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। বাংলাদেশের হাসিনা সরকারকে তাই প্রতিবেশী ভারতের আগামী দিনগুলোর রাজনীতি সম্পর্কে যেমন সাবধান থাকতে হবে, তেমনি অসীম ধৈর্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সাথে দিল্লীর সঙ্গে সমঝোতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখারও চেষ্টা চালাতে হবে। শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দ্বারা এই চেষ্টাতেও সফল হবেন এটা আশা করা যায়।
লন্ডন ১৭ মে শনিবার, ২০১৪
