মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরে মেঘনায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ শনিবার উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ ৪১ ঘণ্টা চেষ্টার পর অবশেষে সকাল ৯ টায় লঞ্চটিকে উদ্ধার করে কাত অবস্থায় তীরের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়। দুপুরে লঞ্চটিকে সোজা করা হয়। এরপর লঞ্চের ভেতর এবং আশপাশ থেকে লাশ উদ্ধার করেন ডুবুরীরা। শনিবার উদ্ধার করা হয় ২৩ জনের লাশ। এ নিয়ে শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত মোট লাশ উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৫। এদের মধ্যে পুরুষ ৩১, নারী ১৩, শিশু ১১ জন। ৫৪টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৬ জন। এসব তথ্য দিয়েছেন গজারিয়ার ইউএনও ড. এটি এম মাহাবুবুল করিম। তিনি জানান, এ ঘটনায় এখনো কোন মামলা হয়নি। এদিকে নিখোঁজের সংখ্যা সরকারি হিসাবে ৬ জন বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার বিকাল সোয়া ৩টায় জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল প্রেস ব্রিফিং করে দ্বিতীয় দফা লঞ্চ উদ্ধার কাজের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তবে নিখোঁজদের খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন মেঘনা নদী ও এর আশপাশে উদ্ধার কাজ অব্যাহত রাখবে বলে তিনি জানান। নৌ বাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশ ইতোমধ্যেই নদীতে সন্ধান চালাচ্ছে। কারও স্বজন নিখোঁজ রয়েছে কি না তা জানতে মাইকিং করা হয় এবং শরীয়তপুর প্রশাসনের সাথেও যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। এর আগে শনিবার সকাল ৯টায় লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ উদ্ধার অভিযান প্রথম দফা সমাপ্তি ঘোষণা করেন বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার। লঞ্চটি উদ্ধারের সাথে সাথেই তিনি উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করে বলেন, লঞ্চ উদ্ধার সম্পন্ন হয়েছে। উদ্ধার কাজের আর কিছু নেই। তবে এখন লাশ উদ্ধার চলবে। এ ঘোষণায় স্বজনহারা জনতা উত্তেজিত হয়ে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ে হামলা চালায়। তারা পানির উপর কাত হয়ে থাকা লঞ্চটি সোজা করার দাবি জানিয়ে বলেন, লঞ্চটি সোজা করে এর ভেতর আর লাশ আছে কি না দেখা দরকার। সে পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চালাতে হবে। এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট মৃনাল কান্তি দাস ও জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের আশ্বস্ত করেন। তারা বলেন, একজন যাত্রী নিখোঁজ থাকা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলবে। পরে সকাল সাড়ে ১০ টায় তাদের নির্দেশে পুনরায় উদ্ধার কাজ শুরু হয়।
আহাজারি ঃ লঞ্চটি উদ্ধারের পর মেঘনা তীরে খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষমাণ স্বজনদের গগনবিদারী আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠে। নিহতদের অধিকাংশই শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। তিনদিন ধরে মেঘনার পাড়ে অপেক্ষার পরও শ্যালক মুছা শেখকে (২৭) না পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মোহাম্মদ হোসেন। পরে তিনি নৌকা নিয়ে লাশ খুঁজতে বের হন। লঞ্চটি সম্পূর্ণ উদ্ধারের পর স্বজনদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়।
এদিকে মুন্সীগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. জাকির হোসেন মজুমদার শনিবার দুপুরে বলেন, নিখোঁজ কতজন তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে স্বজনহারা যারা লাশের অপেক্ষায় মেঘনা তীরে রয়েছেন তাদের সংখ্যা ৬০/৭০ এর বেশি হবে না। এদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের বিচার দাবি করেছে স্বজনহারারা। উদ্ধার কাজ অসমাপ্ত রেখে উদ্ধার কাজ সমাপ্তির ঘোষণা এবং সঠিক ভাবে উদ্ধার কাজ পরিচালনা না করার অভিযোগে নৌমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের বিচার দাবি করেন তারা।
লঞ্চে যাত্রী ছিল ৩৬৫ ! ঃ দুর্ঘটনার সময় লঞ্চের যাত্রী ছিল ৩৬৫ ! এই দাবি করা হচ্ছে যাত্রীদের পক্ষ থেকে। বেঁচে যাওয়া লঞ্চের কেরানিকে জিজ্ঞেস করলেও সব তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে তারা দাবি করেন। এই সংক্রান্ত কিছু প্রমাণাদিও তাদের কাছে রয়েছে বলে তারা জানান। এ হিসাব অনুযায়ী লঞ্চের সাধারণ যাত্রীর টিকেট কাটা হয়েছিল ৩৩০ জনের। কেবিনে ছিল ২১ জন এবং সুখানি-কেরানিসহ মোট স্টাফ ছিলেন ১৪ জন। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র গজারিয়ার ইউএনওর কাছে জমা দেয়া হয়েছে। ইউএনও ড. এটিএম মাহবুব করিম শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপিকা মোসাহিদা সুলতানা লঞ্চের টিকেট বিক্রির হিসাব সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। আজ এব্যাপারে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবেন। জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান এব্যাপারে জানান, যাত্রী বেশি থাকলেও নিখোঁজ বেশি নেই। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর অন্তত ৪৩ যাত্রী তীরে উঠে আসে এমন তালিকা তাদের কাছে আছে। হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন অন্তত ১৫ জন।
গুমের অভিযোগ ঃ মুন্সীগঞ্জে মেঘনা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় লাশ গুমের অভিযোগ করছেন নিখোঁজের স্বজনরা। তাদের দাবি, এমভি মিরাজ-৪ নামক লঞ্চটিতে তিনশ’রও বেশি যাত্রী থাকলেও বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান বলেছেন, এক থেকে দেড়শ’ যাত্রী ছিলেন। দৌলতপুরের মেঘনার পাড়ে লাশের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের অভিযোগ, শুক্রবার থেকে যেসব লাশ উদ্ধার হয়েছে তার অধিকাংশ লাশেরই পেট কাটা ও নারীভুরি বের করা ছিল।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টার দিকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরের কাছে ঝড়ের কবলে পড়ে মেঘনায় আড়াইশ’ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪। লঞ্চটি বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের উদ্দেশ্যে ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে আসে।
শরীয়তপুরে ৩২ লাশ ঃ শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, একের পর এক লাশ আসছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর লঞ্চঘাটে। লাশে পচন ধরে দুর্গন্ধ হয়ে গেছে। শরীয়তপুরের সুরেশ্বর লঞ্চঘাটে এ পর্যন্ত ৩২ টি লাশ এসেছে বলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করেছেন। এগুলো নিহতদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় ৩ জন ও ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ১ জন নিখোঁজ থাকার কথা স্বীকার করেছেন শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন। এদিকে শনিবার দুপুরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য বিএম মোজাম্মেল হক সুরেশ্বর লঞ্চঘাটে এসে নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন।
