প্রজন্ম প্রতিনিধি

রংতুলির কবি

আপডেট : ১৮ মে ২০১৪, ১৯:৪৬
উত্তম ঘোষ। চিত্রশিল্পী হিসেবে সুপরিচিত হলেও তিনি একাধারে কবিতা লেখেন, গান করেন, গান লেখেন, সুর করেন, অভিনয় করেন, আবৃত্তি করেন, নকশা করেন। শিল্পকলার মৌলিক ধারার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে যার শিল্পচেতনা স্বতন্ত্র হতে বাধ্য। পূর্ণাঙ্গ শিল্পসত্তা ধারণের কারণে তার আঁকা ছবি দর্শকের কাছে ভিন্ন আবেদন তৈরি করে। এই প্রজন্মের সফল এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার কর্মময় জীবনের নানা দিক জানতে সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সৈয়দ শিশির শৈশব ছিল খুবই আনন্দের। দুরন্ত হলেও ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুবই মেধাবী। নরসিংদিতে জন্ম হলেও তার শৈশব কেটেছে ঝালকাঠি শহরে। যখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র, তখনই তিনি সাঁতার কেটে সুগন্ধা নদী পার হতেন। ধানসিঁড়ি নদী পার হতেন প্রিয় শিক্ষকদের মুখচ্ছবি দেখার জন্য। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তার বিশেষ দুর্বলতা। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় গান গাওয়া শুরু করেন। পাশাপাশি ছবি আঁকতেন। খেলা করার খুব একটা সময় পেতেন না। প্রায় প্রতি বিকেলেই প্রিয় বন্ধু হিরু, গোবিন্দ আর যোশেফদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। এক্ষেত্রে পরিবার কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তরুণবেলায় ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ পাননি বলে খুবই মন খারাপ হয়েছিল তার। পরে ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে, কিন্তু এখানে মন টিকে না বলে চলে গেলেন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে। সেখানে তার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের অভাব ছিল না। কলেজে পড়ার সময়ই নজরুল একাডেমিতে গান শিখতেন, নাটক করতেন, নাচতেন। নাচ ও অভিনয় শেখাতেন কমল দিদি। এক পর্যায়ে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইচ্ছে ছিল সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়ার, কিন্তু সুযোগ না পেয়ে এবং পরিবারের সদস্যদের পছন্দের বিষয় ফিন্যান্সে ভর্তি হন। ডাকসুতে তখন তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন। পদাতিক নাট্য সংসদের সদস্য হিসেবে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু করেন। ১৯৯১ সালে প্রিয়জন প্রয়াত সঞ্জীব দা’র পরামর্শে স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেন এবং মাস্টার্সের জন্য আইসিসিআর-এ ভর্তি হন। শান্তি নিকেতনে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে সম্মিলিতভাবে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। শান্তি নিকেতনের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা ছিল, কারণ তার ঠাকুর মা-ও সেখানে পড়াশোনা করেছেন। শান্তি নিকেতনে উত্তম ঘোষ নাটক আর চিত্রকলা নিয়ে মগ্ন থাকতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে নাট্যকলায় প্রধানত অভিনয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে নাট্যকলায় পড়ানো হয় অভিনয়, সেট ডিজাইন, কস্টিউম ডিজাইন, মেকআপ, লাইট সেট ডিজাইন, পেইন্টিং ফর ক্রিয়েশন অ্যান্ড আর্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে।’ সেখানে তাদের নাট্যকলার ক্লাস নিতেন নন্দলা বসুর ছাত্র পরিতোষ বন্দোপাধ্যায়। তখন নাট্যচর্চায় তার গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয় ছিল মণিপুরী নৃত্য। সেই সময়টাতে তার স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ওস্তাদ জিতেন সিং। ছোটবেলা গান গাইতেন বলে আবারও শুরু হলো গানের চর্চা। এ সুবাদে ছুটে যেতেন বাচ্চু দি’র বাড়িতে, নিলীমা সেনের বাড়িতে কিংবা মৌ দি’র বাড়িতে। পাশাপাশি ওস্তাদ মোহন সিংয়ের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিতে থাকলেন। একসময় গানের প্রতি আরও মনোযোগী হলেন। শুরু করলেন ক্ল্যাসিক্যাল আর রবীন্দ্রসংগীত চর্চা। তখন গান লেখা শুরু করলেন। শান্তি নিকেতনে ভালো ফলাফল করার পর স্কলারশিপ নিয়ে ছুটে গেলেন প্যারিসে। সেখানে পড়াশোনা শেষ করে আবারও ফিরে এলেন কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ শেষে ২০০০ সালে ফিরে আসেন ঢাকায়। এ পর্বে পদাতিক নাট্য সংসদে যোগ দিয়ে একটি নাটকে নির্দেশনা দিলেন। মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করলেন নাচ, গান, অভিনয় ও ছবি আঁকার স্কুল। সোনারগাঁও হোটেলে একদিন গান গাইছিলেন। তার গান জার্মান নাগরিক ফাদার ক্লাউজের খুব ভালো লাগল। ভদ্রলোকের বনানীতে ‘আনন্দ’ নামে একটি এনজিও রয়েছে, এ নিয়ে প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশে কাজ করছেন। সেখানে উত্তম ঘোষ প্রশিক্ষক হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর কাঠমুণ্ডুতে ইউরোপীয় কমিশনে কিছুদিন কাজ করেন। ‘অগ্নিবীণা’ থেকে ২০০৯ সালে তার লেখা ও সুরে বের হওয়া অ্যালবাম ‘উত্তমের গান’ সুধীমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হলেও এর বাজারজাতকরণ পদ্ধতি ছিল দুর্বল। যে কারণে মফস্বলের শ্রোতাদের হাতে অ্যালবামটি পৌঁছেনি। অ্যালবামটি একাধিক পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছে। বর্তমানে নতুন অ্যালবাম নিয়ে কাজ করছেন। এটি লেজার ভিশনের ব্যানারে বাজারে আসছে। এতে নিজের ৪টি গানসহ রয়েছে বন্ধু জাহিদ, শহীদুল্লাহ ফরাজী, বিদ্যুত্ বসু ও কাজী বর্ণাঢ্যের গান। প্রতিটি গানই উত্তম ঘোষ গেয়েছেন। সংগীত পরিচালনায় রয়েছেন মুন। তিনি মনে করেন, আমাদের দেশের মতো বিশ্বের কোনো দেশেই সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে এত বাধা নেই। এখানে ভালো আঁকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না থাকলে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ তার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করেও পৃথিবীতে অনেকেই স্বীয় কর্মগুণে বিখ্যাত হয়েছেন। তাই এ বাঁধ ভাঙতে হবে।’ তার ছবির বিষয়গুলো দৈনন্দিন গ্রাম্য জীবনের খণ্ডচিত্র, নর-নারী, ফুল, পাখি ইত্যাদি। এসব ছবিতে পাওয়া যায় স্বাভাবিক সৌন্দর্যের আন্তরিক প্রকাশ। তার ছবি প্রসঙ্গে ড. তপন বাগচীর মন্তব্য হলো, ‘বাঙালির চিরায়ত ও লোকজ জীবনের প্রতিবিম্ব অঙ্কনে উত্তম ঘোষ বরাবরই সফলতার ছাপ রেখেছেন।’ তিনি গুরু মেনেছেন প্রখ্যাত শিল্পী কে জি সুব্রামানিয়ানামকে। তার দেখানো পথ ধরেই উত্তম এতটা এগিয়েছেন। ছবি আঁকায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে ক্যানভাসে এক্রিলিক ব্যবহার করেন। তিনি ছবি আঁকেন মনের খেয়ালে। স্বভাবকবির মতো আপন খেয়ালে ছবি আঁকলেও তাকে স্বভাবশিল্পী বলা যাবে না। তিনি লোকায়ত জীবনকে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট থাকেন আধুনিক দৃষ্টি ও মনন দিয়ে। যে কারণে প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। শান্তি নিকেতনে অনার্স পড়ার সময় ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারে ১৯৯৫ সালে তার আঁকা ছবি নিয়ে ১ম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। সম্প্রতি গুলশানের ইয়ের্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হলো তার ৮ম প্রদর্শনী। ২০০৩ সালে গুলশানের কামরাঙ্গা গ্যালারিতে আয়োজন করা হয়েছিল বিবি রাসেল ও উত্তমের যৌথ প্রদর্শনী। তার নির্দেশনায় ‘ফিশারম্যান অব বাংলা’ (২০০২) ও ‘বিবি’স ওয়ার্ল্ড’ নামের দুটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। মঞ্চে তার নির্দেশনা দেওয়া উল্লেখযোগ্য নাটক হলো—‘ভূত-পাত্রীর যাত্রা’ (বহুরূপী থিয়েটার, ১৯৯৯) ও ‘খেতমজুর খাইমুদ্দীন’ (পদাতিক নাট্য সংসদ ২০০০)। ‘রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা’, ‘রাইমতো ফিল্ম সোসাইটি, ঢাকা’-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তিনি আজীবন সদস্য। এ পর্যন্ত তিনি গুরুত্বপূর্ণ যেসব পদক, পুরস্কার লাভ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—Alegabed Greensild, Canada, 1998; Best C.D of year-BBSS, Dhaka, 2009; Best singer-BBSS, Dhaka, 2010; Designer of year-Dhaka Fashion week, 2011; বর্তমানে তিনি ‘Aparajito Enabler Ltd.-এর পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক—এমনটিই কাম্য।