স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

আপডেট : ১৮ মে ২০১৪, ১৯:৪৭
এ যুগে ভেজালমুক্ত খাদ্যের খুবই অভাব। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দিন দিন আমরা হারাচ্ছি শারীরিক সুস্থতা। সবাই এতটা কর্মব্যস্ত যে, জীবন নিয়ে ভাবনার সময়টাও যেন আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের জীবন নিয়ে ভাবেন একজন, তিনি— শাহজাহান শাহীম। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে অর্গানিক কৃষি বাজার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রায় এক যুগ ধরে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। মানুষ ও প্রকৃতি—এই দুই সৃষ্টিকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখেন। যে স্বপ্নের বীজ থেকে জন্ম নিয়েছে ‘চিত্রা অর্গানিক কৃষি বাজার’। অর্গানিক বলতে বুঝায়—আদি, আসল ও খাঁটি পণ্য। এসব পণ্য রাসায়নিক সার ও কেমিক্যালমুক্ত। সাংবাদিক, নির্মাতা, সংগঠক ও গবেষক হিসেবে সুপরিচিত মানুষটি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন সুস্থ মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে তার এ কার্যক্রম তথা উদ্যোগের সুফল আজ রাজধানী ঢাকার বুকেও ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যতিক্রম ভাবনার সফল উদ্যোক্তা শাহজাহান শাহীম আমাদের আজকের প্রজন্ম প্রতিনিধি, তার সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সৈয়দ শিশির বাংলাদেশে অর্গানিক আন্দোলনের অগ্রপথিক শাহজাহান শাহীম। একদিন আবার আমরা প্রকৃতির কাছে ফিরে যাব—এমনটিই তার স্বপ্ন ও বিশ্বাস। যখন আমরা ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত খাব, ঘানিভাঙা সরিষার তেলে রান্না করব। কৃষকেরা তখন ফসলে, ফলে, শাকসবজিতে আর কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করবেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—হঠাত্ করে তিনি এই পথে পা বাড়ালেন কেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘কত প্রতিষ্ঠানেই তো চাকরি করলাম। এভাবে তো জীবন চলে না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাসের পর কঠোর পরিশ্রম করেও যদি একমুঠো ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা না থাকে, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হয়েও কর্মস্থলে যদি কর্মের নিশ্চয়তা না তাকে—তা নিশ্চয়ই জীবন-সংসারের জন্য শুভ কোনো পথ হতে পারে না।’ এমন ভাবনা থেকেই তিনি কিছু একটা করতে চাইলেন, যা নিজের এবং দেশের মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে। ২০০৪ সালের কথা। খুলনা জেলার তেরখাদায় চিত্রা নদীর তীরবর্তী এক গ্রাম ‘নাচুনিয়া’। যে গ্রামের প্রান্তিক চাষি মনা মিয়া বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির চাষ করতেন। তার এ কাজে উত্সাহী হয়ে ছোট ভাই উন্নয়ন সাংবাদিক শাহজাহান শাহীম বিভিন্ন উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ করে পাঠাতেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেও অর্গানিক সবজি ও ফসল উত্পাদনের উদ্যোগ নেন। নিম গাছের পাতা ও নিম ফল, মেহগনি গাছের ফল, গরুর চুনা সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তিনি ফসলি জমিতে প্রয়োগ করতে থাকেন। তার দেখাদেখি এলাকার প্রায় সব চাষি আগ্রহী হয়ে ওঠেন অর্গানিক পদ্ধতিতে ফসল ও সবজি উত্পাদনে। কিন্তু বাঁধ সাধে এসব পণ্যের বাজারজাতকরণে। বিষয়টি উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে ভাবিয়ে তুলে। তিনি সরসারি প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে উত্পাদিত পণ্য বিপণনের উদ্যোগ নেন। মাত্র ৪০০ টাকা মূলধন খাটিয়ে ২০০৪ সালেই তিনি অর্গানিক কৃষিবাজার প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে তিনি ১০ কেজি হাতে ভাজা সারমুক্ত মুড়ি নিয়ে বিপণনের কার্যক্রম শুরু করেন। তখন সহযোগিতা বলতে কিছুই পাননি। বরং নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন। পরিবারের সদস্য, সহকর্মীদের সবাই বলতে থাকেন—‘এসবে কিছু হবে না। এসব বাদ দাও। মন দিয়ে চাকরি কর’—এমনসব কথা। তিনি থমকে দাঁড়াননি। বর্তমানে ৬টি আউটলেটের মাধ্যমে তিনি বিপণনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এরমধ্যে ৪টি একেবারেই নিজস্ব। খুব শিগগিরই আরও ২টি আউটলেট চালু হতে যাচ্ছে বলে জানালেন শাহীম। সরাসরি মাত্র ২০ জনের কর্মসংস্থান হলেও গড়পরতা সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। আউটলেটের পাশাপাশি ৪টি বাজারসহ বিভিন্ন শপিংমল ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ঢাকার খিলগাঁও ও মালিবাগ শাখা থেকে হোম ডেলিভারির সুব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কমপক্ষে ২ হাজার টাকার পণ্য ক্রয় করতে হয়। চিত্রা অর্গানিক কৃষিবাজারের মূল বিক্রয়কেন্দ্রটি ৮০ মালিবাগ, ডিআইটি রোড, ঢাকায় অবস্থিত। প্রায় ১১০ ধরনের পণ্য বিক্রি হয় অর্গানিক কৃষিবাজারে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে হাতে ভাজা সারমুক্ত মুড়ি, আউশ চাল, কাউন চাল, ডাল, খাঁটি মধু ও ঘি, মাশরুম, লাল আটা, আখের গুড়, বিট লবণ, স্পিরুলিনা, কোয়েলের ডিম, অর্গানিক সবজি, কুমড়া বড়ি, মুড়ি ও যবের ছাতু, কালোজিরার তেল, তিলের তেল, সরিষার তেল, অর্গানিক প্রসাধনী ও চা, লাচ্ছা সেমাই, পোলাওয়ের চাল, নানা ধরনের বীজ ও সয়ামিট। এসব পণ্যের অধিকাংশই আসে খুলনা থেকে। তবে টাঙ্গাইল, বান্দরবান, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পণ্য আনা হয়। এসব পণ্য বর্তমানে প্রায় একই বাজার দরে বিক্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমরা এখনও লাভের তুলনায় বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। ’ ‘এক হলে পারি, একা হলে হারি’—এই স্লোগানের প্রেরণা নিয়েই অলাভজনকভাবে উত্পাদন থেকে সরাসরি ভোক্তার হাতে প্রাকৃতিক পণ্য পৌঁছে দিয়ে অগণিত মানুষের সুস্থ জীবন, আয় ও পণ্যমান নিশ্চিত করে চলেছে শাহীমের ‘চিত্রা অর্গানিক কৃষি বাজার।’ ‘মানুষের মাঝে মানুষের কাজে’ নামে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার অর্গানিক কৃষি বাজারের সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা ও করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনামূলক সভার আয়োজন করা হয়। চিত্রার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দুস্থদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিত্সা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা প্রদান করা হয়ে থাকে। ঢাকার মালিবাগস্থ মূল বিক্রয়কেন্দ্রে প্রতিবছর জুন মাসের ১৫ থেকে জুলাই মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আয়োজন করা হয় ‘অর্গানিক আম মেলা’র। অধূনা প্রতিষ্ঠানটির একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘অর্গানিক ফার্মল্যান্ড ট্যুরিজম’স। এ প্রসঙ্গে শাহীম বলেন, ‘কম সময়ে, কম খরচে প্রকৃতি ও ফসলের বৈচিত্র্য দেখার সুযোগ করে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’ তিনি মনে করেন, সারা বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের আকর্ষণের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আর সব ধরনের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী প্রায় শতাধিক অর্গানিক চাষি, গবেষক, কৃষিবিদ, সাংবাদিক, চিকিত্সক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর এক বিশাল নেটওয়ার্ক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিষমুক্ত অর্গানিক পণ্য সরবরাহের প্রস্তুতিপর্বে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে মুড়ি গ্রাম, সবজি গ্রাম ও ফরমালিনমুক্ত মাছের গ্রাম। সুস্থ ও সুন্দর থাকার স্বপ্নের ফেরিওয়ালার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে কিছু সময়ের ব্যবধানে হলেও—এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা। শাহজাহান শাহীম ডাকনাম :শাহীম জন্মতারিখ ও স্থান :৩০ নভেম্বর, নাচুনিয়া, তেরখাদা, খুলনা। মায়ের নাম :রিজিয়া বেগম বাবার নাম :মৃত. মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মোল্যা প্রথম স্কুল :নাচুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় উক্তি :‘এক হলে পারি, একা হলে হারি’ প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :অবসর নেই সাফল্যের সংজ্ঞা :সততা, বিচক্ষণতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই সফলতা অর্জন সম্ভব।