নাফিউর রহমান ইমন
মানুষ তাঁর অবসরের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটাতে ভ্রমণ করে। সারাদিনের কাজের একঘেঁয়েমি যখন বিষিয়ে তোলে, তখন সমুদ্রের নোনা জলে পা ভিজিয়ে মনকে শীতল করে। কেউবা আবার দূর দিগন্তের শুভ্র মেঘমালা কিংবা পাথরের গায়ে আটকে থাকা স্বচ্ছ জলকণা দেখে জীবনের মানে খোঁজে। কিন্তু এর বাইরেও মানুষ তাঁর নিজেস্ব সংস্কৃতি খোঁজে, যেখানে ইতিহাস ঐতিহ্যর সন্ধান পাওয়া যায়। পোড়ামাটি, ভাঙাচোরা দালানকোঠা, পঁচা আবর্জনায় ভরা কুয়ো, সবকিছু যেন এক বিচ্ছিরি অনুভূতি। তারপরও মানুষ এসব দেখতে যায়। হয়তো কিছু একটা আছে বৈকি। মানুষ স্বভাবতই তাঁর শেকড়ের সন্ধান করে। পুরোনো ঐতিহ্যে ইউরোপ কিংবা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার চেয়ে ঢের পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ভ্রমণপিপাসুদের আগ্রহ মেটাতে সক্ষম। এ রকমই একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যর নিদর্শন বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। গন্তব্য এবার এখানেই।
এ যেন স্মৃতির পটে আঁকা বৃহত্ এক আলপনা। হাল আমলের নানা স্মৃতি নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আছে আজো। ৫.৮৮ একর জমিতে নির্মিত জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে একটি বড় পুকুর। বাড়ির সম্মুখভাগে ৪টি সুবিন্যাস্ত সিংহদ্বার সমৃদ্ধ ৪টি বিশাল প্রাসাদ পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সুদৃশ্যভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকেই দেখলাম মুক্ত উদ্যান। মূল ফটকে ছোট ছোট অনেকগুলো কুঠোরি (সেল)। হয়তো এককালে নিরাপত্তারক্ষীরা এই সেলে বসেই পাহাড়া দিতো রাত জেগে। ভেতরটা বেশ ছিমছাম, বড় বড় সিন্দুক দিয়ে নিচতলা সাজানো। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের ঘরে উঠে দেখলাম পুরোনো ল্যাম্প, বন্দুক, টুল, খাট, আলনা, গানের যন্ত্র আর বড় বড় আয়না। আয়নার প্রতিচ্ছবি সারা ঘরে ছড়িয়ে যায় অনেকগুলো নিজেকে। আসল মানুষটিকে তখন বের করা খানিকটা কঠিনই। মেয়েরা সবসময়ই স্বভাবতই ছবি তুলতে ভালোবাসে। সেলফির ঢঙে ছবি তুলতে চাইলে বাঁধা দিলো দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীরা। কী আর করার আছে? আইন তো মানতেই হবে। তাই নিচে নেমে অন্দরমহলে যাওয়ার পথে কয়েক দফা ছবি তুলে নিলো সবাই। মূল বাড়িতে ৭টি প্রাসাদতুল্য দালানে আছে প্রায় ২০০টি কক্ষ। উত্তর দিকে গেলে লম্বা কাঠের কারুকার্য করা ২টি ভবন চোখে পড়বে। ধারণা করা হয়, এগুলো জমিদারদের দাসী-বাদী, ঘোড়ার দেখাশোনা করে এমন যাঁরা ছিল তাঁদের জন্য নির্মিত হয়েছিল। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল ৬ ঘাট বিশিষ্ট একটি পুকুর। কালের আবর্তনে পুকুরঘাট হারিয়েছে তার অবয়ব। হারিয়েছে স্বচ্ছ জলকণায় পরিপূর্ণ জলরাশি। এ যেন এক নির্মম ইতিহাস।
পুরাকীর্তির ইতিহাসে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ঊনিশ শতকের এক অনন্য সৃষ্টি। আনুমানিক ১৭৯০ সালের দিকে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। বালিয়াটির জমিদারদের পূর্বপুরুষ গোবিন্দ রায় সাহা ছিলেন একজন ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী। তাঁর ছিল ৪ পুত্র। দধি রাম, পতি রাম, আনন্দ রাম ও গোলাপ রাম। উত্তরাধিকারদের কেউ একজন হয়তো জমিদারি লাভ করেছিলেন। এই প্রাসাদের অন্তর্গত বিভিন্ন ভবন জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকার কর্তৃক নির্মিত হয়। গোবিন্দ রায়ের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে ছিলেন নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী, বৃন্দাবন চন্দ্র, জগন্নাথ রায়, কানাই লাল, কিশোরী লাল, যশোর্ধ লাল, হীরা লাল রায় চৌধুরী, ঈশ্বর চন্দ্র রায় চৌধুরী, হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী প্রমুখ।
ইতিহাসের টেরাকোটায় খানিকক্ষণ বিশ্রাম, তারপর আবার ছুটে চলা। পূর্ব আকাশের সূর্য হেলে পড়ে পশ্চিম দিকে। পড়ন্ত বিকেলে ম্রিয়মাণ সূর্যের দিন বুঝি ফুরিয়ে যায়। দেখতে দেখতে আমাদেরও সময় শেষ হয়। সময় যে বড় নিষ্ঠুর। এবার ফিরে যাওয়ার পালা। ফেরার আগে আর একবার দেখে নিই কারুকাজ সংবলিত কাঠের দরজা, পোড়ামাটির শিল্পকর্ম আর ইটের দেয়াল। দেয়ালে মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। ভাঙা কাঠের দরজা, জানালা আর লোহার শিকগুলো মরিচা ধরেছে। পোড়া ইটের গাঁথুনির দোতলা বাড়িগুলোও পড়ে আছে অবহেলায়। অবেলায় প্রবেশ করা যে দুঃসাধ্য। নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় জমিদার বাড়ি যেন হাজারো ক্ষতচিহ্ন বহন করে। বহন করে ইতিহাসকে, যা এককালে ছিল কিন্তু এখন আর নেই। ইতিহাসের সাক্ষী নয়নাভিরাম এমন দৃশ্য দেখতে চাইলে পরবর্তী ট্যুরের আগে আপনারও একবার ভেবে দেখা উচিত।
