বুড়িগঙ্গা নদীকে দেখিলে যেকোনো সচেতন মানুষের মনে গুঞ্জরিত হইতে পারে এই বাণী—দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর। একই অবস্থা ঢাকার আশপাশের অন্য সকল নদীরও। এই সকল নদীর ঘনকৃষ্ণ কুিসত জলরাশি যেন প্রবহমান গরলধারা! যেই নদী এখনও তাহার তীরবর্তী জনপদের সমৃদ্ধির কারণ হইতে পারিত, সেই নদীই এক্ষণে হইয়া উঠিয়াছে প্রাণহন্তারক। কিন্তু এই জন্য এইসব নদীরই-বা কী দোষ, যদি সভ্যতার নিমিত্ত সভ্যতাবিনাশী অবিবেচক মানুষ তীব্র দূষণ ঘটায় পলিথিনের মাধ্যমে; আর তাহার সহিত যুক্ত হয় ট্যানারির ভয়াবহ বর্জ্যদূষণ! দুই শত কোটি টাকা খরচ করিয়া বুড়িগঙ্গার তলদেশ হইতে পলিথিনের নিষ্কাশন চেষ্টা চলিলেও রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারিসমূহের স্থানান্তর সম্ভব হয় নাই এখন অবধি। এবং তাহা যতদিন না হইতেছে, ততদিন অবধি বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকাবেষ্টিত নদীসমূহের অবস্থা সঙ্গিনতর হইতেই থাকিবে।
দেশের চামড়াশিল্পের সিংহভাগ কারখানার অবস্থান হাজারিবাগের মতো এমন একটি এলাকায়, যাহা যতোটা না বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, তাহার অধিক তুল্যমূল্যের ক্ষতিসাধন করে সামগ্রিক পরিবেশের। বিভিন্ন সংস্থার মতানুযায়ী বর্তমানে হাজারিবাগের ট্যানারিসমূহ হইতে নিঃসৃত অপরিশোধিত তরল বর্জ্যের কারণে বত্সরে আনুমানিক চল্লিশ কোটি টাকার সমপরিমাণ পরিবেশগত ক্ষতি হইতেছে। স্লো পয়জনের মতো এই ক্ষতি ছয় দশক ধরিয়া উত্তরোত্তর বাড়িতেছে, যাহা সুদূরপ্রসারী হইতে বাধ্য, যদি না অধিক বিলম্ব ঘটে ট্যানারিসমূহ স্থানান্তরের। বর্তমানে বুুড়িগঙ্গা নদীর দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ শূন্য। অথচ জলজ প্রাণীর জন্য প্রতি লিটার পানিতে ন্যূনতম ৬ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন অপরিহার্য। এই এলাকার ট্যানারি বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় মিশিয়া নদীটির মত্স্য ও জলজ প্রাণীর বিলুপ্তির কারণ ঘটাইয়াছে। ট্যানারিসমূহ দৈনিক কমবেশি যেই ২২ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলিতেছে, তাহাও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ। তাহা ছাড়াও প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ মেট্রিক টন কঠিন অতি বিপজ্জনক কঠিন বর্জ্য তৈরি করে এই সকল ট্যানারি। এইসব বিপজ্জনক বর্জ্যের তালিকায় রহিয়াছে ক্রোমিয়াম, লেড, সালফিউরিক এসিড, হাইড্রোজেন সালফাইড, ফরমিক এসিড, ব্লিচ, ডাই, তেল, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহূত বিভিন্ন ভারী ধাতু, চুন, পশুর মাংস, দ্রবীভূত চুল, চর্বি ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই এইসব বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্যাদি পানি, বায়ু, মাটির দূষণ ঘটাইতেছে নিরন্তর। তাহা যে জনস্বাস্থ্যের নীরব কিন্তু ভয়াবহ ঘাতক তাহাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক জরিপেও দেখা গিয়াছে, শুধু হাজারিবাগ ট্যানারি হইতে দৈনিক ৭৭ লাখ লিটার তরল বর্জ্য ও ৮৮ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য উদ্গত হয়। তাই হাজারিবাগ এবং আশপাশের এলাকার ব্যাপক পরিবেশ দূষণ এবং বিশেষত বুড়িগঙ্গাকে নবজীবনে ফিরাইতে হইলে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করিতেই হইবে। এবং অবশ্যই নির্মাণ করিতে হইবে অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। কেননা শিল্পটিতে আধুনিক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার চালু করাও জরুরি বটে। বর্জ্য যথাযথ পরিশোধনের পরই তরল এবং কঠিন বর্জ্য কোনো ডাম্পিংস্থলে অপসারণ করা না হইলে বিপদ পিছু ছাড়িবে না।
স্বস্তির কথা হইল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং হাজারিবাগের ট্যানারির এই বিপজ্জনক দিকসমূহের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ও সচেতন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের বিষয়ে তাহার উদ্বেগ অপ্রকাশিত নহে। হাজারিবাগ হইতে সাভারে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের কার্যকর উদ্যোগও গ্রহণ করা হইয়াছে বলিয়া আমরা জানিতে পারিয়াছি। ট্যানারি মালিকগণও এই ব্যাপারে অসম্মত নহেন। এমতাবস্থায় আশা করা যায় শীঘ্রই ট্যানারিসমূহ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হইবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, সভ্যতা বিকাশের জন্য শিল্প অপরিহার্য হইলেও সুব্যবস্থিত না হইলে পরিবেশ বিপর্যয় যে ঘটাইতে পারে হাজারিবাগ ট্যানারি তাহার বড় প্রমাণ। এই বাস্তবতায় সঠিক সিদ্ধান্ত ও আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া ইহাকে ঝুঁকিমুক্ত করা অত্যাবশ্যকীয়।
