বাংলাদেশের মানুষ বড় উত্সুক জাতি। সবকিছুর ব্যাপারেই অতিআগ্রহ তাদের। বিচিত্র এই দেশ। তারচেয়েও বিচিত্র এদেশের মানুষের মন। রাস্তায় একটা গর্ত খুঁড়তে থাকলে কিছু লোক ওখানেও উঁকি মারতে থাকে কী ঘটছে দেখার জন্য। প্রতিদিন পত্রিকা খুলে চমক দেখতে চায়। টিভির খবরে নতুন চটকদার কিছু না থাকলে হতাশ হয় দর্শক। চমক ছাড়া এই ভোটারদের মন জয় করার কোনো উপায় নেই এটা বুঝেই রাজনীতিবিদগণ ভোটারদের অনবরত চমক দেখানোর চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন। গণতন্ত্রে জনগণকেই সব ক্ষমতার উত্স ধরা হয় এবং আমাদের নেতারা সেটি জোরেসোরে উচ্চারণও করেন। কিন্তু বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে এটা সত্য যে, একমাত্র ভোটের দিন ছাড়া জনগণের হাতে কোনোদিনই কোনো ক্ষমতা থাকে না। তাই ভোটার তার নিজের চমক দেখানোর জন্য বেছে নেয় ভোটের দিনটিকেই।
বাংলাদেশের মানুষ অতিথিপরায়ণ আর খুবই অভিমানী। তবে হুজুগে। কোনোভাবে একটা হুজুগ তুলে দিতে পারলেই হলো, সব হিসাব উলটে দিয়ে তছনছ করে দেবে সবকিছু। কখন যে কী করে বসবে নিজেও জানে না। রাগ এবং অভিমান করে এমনসব সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে যে, তার ভোগান্তি পোহাতে হয় দীর্ঘ সময়। এর পাশাপাশি মাফ করে দেওয়ারও এক বিশাল ক্ষমতা রয়েছে আমাদের জনগণের। একটু পিঠে হাত বুলিয়ে, একটু কাঁদোকাঁদো মুখ করে বললে অনেক কিছু মাফও করে দেয় তারা। এই মাফ করার গুণ যে কত ভয়ংকরভাবে প্রত্যাঘাত করতে পারে তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে। সেদিকে যাবো না। তবে সবচেয়ে বড় যে গুণটি আমাদের জনগণের রয়েছে তা হলো, দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। সমস্যা যত বড়োই হোক, ভালোভাবে বুঝিয়ে মোটিভেট করতে পারলে সহজেই বিষয়টা আত্মস্থ করার এক অবিশ্বাস্য দক্ষতা রয়েছে এ জাতির।
মোটিভেশনের মাধ্যমে অনেক বড় সমস্যাও যে কত সহজে সমাধান করা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়টি আমাদের দেশে কার্যকর করা হলো। সে সময়, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক এমনকি পারিবারিকভাবেও এটির ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। অনেক জায়গায় পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণকারীকে সামাজিকভাবে একঘরে করা হয়েছে। এই অবস্থায় রাষ্ট্র কী করেছে? পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন, সভা-সেমিনারের মাধ্যমে জনগণের সামনে এর ভালো-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরেছে। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা শুরুর আগে এর বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে। সবই করা হয়েছে জনগণের সামনে এর ভালো এবং মন্দ, দুটি দিক তুলে ধরে তাকে মোটিভেট করার জন্য। কাউকেই পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য বল প্রয়োগ করা হয়নি। ব্যক্তি মানুষ নিজে থেকে বুঝে শুনে এটি গ্রহণ করেছে। ধীরে ধীরে শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এটিকে নিজ ইচ্ছায় গ্রহণ করেছে কারণ সবাই বুঝতে পেরেছে পরিকল্পিত পরিবার না হলে তার কী সমস্যা হবে। আর এই সবই সম্ভব হয়েছে, সাধারণ জনগোষ্ঠীকে মোটিভেশনের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারার ফলে।
মোদ্দা কথা হলো, সাধারণ মানুষকে দৃষ্টান্ত দেখাতে হবে। বোঝাতে হবে। উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যাতে ব্যক্তিমানুষ নিজে বুঝেশুনেই সে বিষয়ের ভালো দিকটি সহজে গ্রহণ করতে পারে। আমার বিশ্বাস, বিদ্যমান জাতীয় সমস্যাগুলো যদি সঠিকভাবে মানুষকে বোঝানো যায় তাহলে জনগণই তা সমাধানে এগিয়ে আসবে নিজ দায়িত্বে। কথা হলো, কে করবে এই মোটিভেশনের কাজ? অবশ্যই রাষ্ট্রই তা করবে। না হলে, হবে না। এনজিওরাও এগিয়ে আসতে পারে।
আমাদের অনেক সমস্যা। ক্রমিক নম্বর দিয়ে সাজালে ১০টি বড় সমস্যা পাশাপাশি ১নম্বরে রাখা যাবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে কোনো একটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। এরপর তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক মোটিভেশন প্রোগ্রাম তৈরি করে গণমাধ্যমে তা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। তবেই তা থেকে সুফল পাবো আমরা। যেমনটা পেয়েছি পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কিংবা পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধের বিষয়ে। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সঠিক মোটিভেশন আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা
