আশঙ্কাই সত্যি বলে প্রমাণিত হলো। মার্শাল ল’ (সামরিক আইন) জারি করার একদিন পর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিল থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়ুথ চ্যান-ওচা গতকাল বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে বিবৃতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও সংবিধান স্থগিত করার ঘোষণা দেন।
দেশটির ক্ষমতাসীন দল পুয়া থাই পার্টি ও প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট পার্টি সমর্থিত বিক্ষোভকারীদের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে চলমান সংঘাতের কারণে নির্দিষ্ট বিরতিতে ‘হুঁশিয়ারি’ দিয়ে আসছিল সেনাবাহিনী। কিন্তু সরকারপন্থি এবং সরকার-বিরোধী দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়ুথ চ্যান-ওচা গতকাল দেশটির স্থানীয় সময় সাড়ে ৪টায় সামরিক অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেন। ক্ষমতা দখলের পর তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দেন, সংবিধান স্থগিত করেন এবং বিক্ষোভকারীদের ঘরে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন।
দেশটিতে গত কয়েক মাসের টানা রাজনৈতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার সামরিক আইন জারি করা হয়। এরপর বিবদমান প্রধান দুই পক্ষকে বুধবার আর্মি অডিটরিয়ামে আলোচনার টেবিলে বসানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের দ্বিতীয় দিনের মতো আলোচনায় আনা হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল চ্যান-ওচা এই আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু উভয় পক্ষ ‘বিচার মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার’ জাতীয় দাবিতে অনড় থাকে। এতে চরম বিরক্ত হন সেনাপ্রধান চ্যান-ওচা। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে অডিটোরিয়াম ত্যাগ করেন। সাথে সাথে সেনা সদস্যরা ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের আটক করে। পরে তাদের একটি সেনাভ্যানে করে ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে সেনাপ্রধান বার্তা বাহকের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিচারমন্ত্রীর কাছে জানতে চান সরকার পদত্যাগ করবে কি না। মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, সরকার পদত্যাগ করবে না। কিছুক্ষণ পরেই ক্ষমতা দখল করার ঘোষণা দেয় সেনাবাহিনী। এরপর রেডিও টেলিভিশনের প্রতি নির্দেশ জারি করা হয় তারা যেন তাদের নিয়মিত সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। এছাড়া দেশব্যাপী রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। একই সাথে একসাথে পাঁচজনের বেশি লোক জড়ো হবার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। দেশজুড়ে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখতে নির্দেশও জারি করে সেনাবাহিনী।
থাই গণমাধ্যমগুলো জানায়, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর নির্বাচন কমিশন ঘিরে ফেলে সেনাবাহিনী। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সহ সকল কমিশনারদের আটক করা হয়। একইভাবে সিনেটের সব সদস্যদেরও আটক করা হয়। তবে পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। সেনাবাহিনী এরপর রাজপথ থেকে বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দিতে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। কিছু বিক্ষোভকারীর শুরুতে রাজপথের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে যায়।
সেনাপ্রধান টেলিভিশন পর্দায় হাজির হন ঠিক সাড়ে চারটায়। এসময় তার দুই পাশে বসা ছিলেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ।
স্বাভাবিক ও ভাবলেশহীন কণ্ঠে চ্যান-ওচা বলেন, ‘দেশে রাজনৈতিক হানাহানি এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল যে রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তা ধ্বংস হয়ে যাবার যোগাড় হয়েছিল। সামরিক অভ্যুত্থান জনজীবনের এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবে, রাজনেতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিশ্চিত করবে। সব পক্ষই সন্তুষ্ট হবে। তিনি জনগণের প্রতি শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং তাদের নিত্যদিনের কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাবার অনুরোধ জানান। এছাড়া সরকারি কর্মচারি, মন্ত্রণালয় এবং সরকারি এজেন্সিকে স্বভাবিক দায়িত্ব নির্ভয়ে চালিয়ে যেতে বলেন।
তিনি জানান, সেনা এবং রয়্যাল থাই পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় শান্তি এবং শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল (এনপিওএমসি) জাতীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। এই কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতিরেকে অস্ত্র বহন করা যাবে না। থাইল্যান্ডের সাথে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের যে কুটনৈতিক ও ব্যাবসায়িক সম্পর্ক যেমন ছিল তা তেমনই থাকবে। রাজকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সেনাবাহিনীর আনুগত্য অটুট থাকবে। সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে ভালো কিংবা খারাপ যেকোন পরিণামের দায় তার একার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেনাপ্রধানের এই বিবৃতির পর দফায় দফায় বিবৃতি জারি করে সেনাবাহিনী। দ্বিতীয় দফায় দেশজুড়ে মার্শাল ল’ কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। তৃতীয় ঘোষণায় আসে দেশজুড়ে কারফিউ এবং চতুর্থ ঘোষণায় রেডিও টিভির স্বাধীনতা স্থগিত করা হয়। পরের দফায় বলা হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়ুথ চ্যান-ওচা এনপিওএমসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং চারজন ডেপুটি নিয়োগ করছেন। এরা হলেন, সুপ্রিম কমান্ডার টানাসাক, নেভি চিফ নারং পিপাত্তান, এয়ারফোর্স চিফ জানথং এবং পুলিশ চিফ সায়েংসিংকায়ে।
পরের ঘোষণায় জনগণকে সামরিক আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয় সামরিক আইন ও কারফিউ ভঙ্গ করলে তাদের ২০ হাজার থাই বাথ করে জরিমানা করা হবে। সাথে সাথে লোকজনের বাড়ি ফেরার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। রাজপথ থেকে যানবাহন দ্রুত উধাও হয়ে যায়। পরিবহন ব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া: মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে জানায়, সেনা অভ্যুত্থানের পর ওয়াশিংটন বিবেচনা করে দেখছে থাই সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে নাকি বিচ্ছিন্ন করা হবে। দুই দেশর সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ট সহযোগিতার সম্পর্ক আছে। অপরদিকে, পেন্টাগনের একজন মুখপাত্র বলেন, যৌথ সামরিক মহড়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।
এদিকে, সেনা অভ্যুত্থান ঘোষণার পর থাই সরকারের তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিওয়াত্তুমরং অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন। বিকাল চারটার দিকে তাকে ব্যাংককের পার্টি অফিসে ঢুকতে দেখা গেছে বলে জানায় বিভিন্ন গণমাধ্যম। কিন্তু ক্যু’র খবর প্রচার হতেই গা ঢাকা দেন তিনি।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সরকারি অফিস, ফ্যাক্টরির রাতের শিফট, হাসপাতাল, বিমান, খাবার শিল্প এবং মানবিক খাত আওতামুক্ত থাকবে। এছাড়া সাধারণ মানুষের যদি জরুরি প্রয়োজন হয় তবে যেন তারা সেনাবাহিনীর অনুমতি গ্রহণ করে।
উল্লেখ্য, গত বছর শেষের দিকে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ভেঙে দিলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কয়েক মাস ধরে ব্যাংককের বিভিন্ন এলাকা দখল করে রাখে বিক্ষোভকারীরা। এ মাসের শুরুতে থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত দেশটির ইংলাককে ক্ষমতার অপব্যবহারে দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু ইংলাকের পদত্যাগের পরও ক্ষমতায় থাকা তার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলে আসছিল। ২০০৬ সালে সেনাবাহিনী ইংলাকের ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই থাইল্যান্ডে ক্ষমতা লড়াই চলে আসছে। দেশটিতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস এবার আরো একটু লম্বা হলো, এই যা।
