এনডিএফবিডি’র আয়োজনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ৮ম জাতীয় বিতর্ক উত্সব। দুইদিনব্যাপী এই উত্সবে দেশের স্বনামধন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের বিতার্কিকরা অংশ নেয়। এই বিতর্ক উত্সবের নানা গল্প নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন এ.আর রহমান আকাশ
ভারতের রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমের ঘোরে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ স্বপ্নটি ছিল দেশজুড়ে যুক্তির আলো পৌঁছে দেওয়া। যার ছোঁয়ায় নির্মিত হবে পরমত সহিষ্ণু, যুক্তিবাদী আলোকিত আগামী। এই স্বপ্ন নিয়েই পথ চলতে থাকা ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ। এই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে চলেছে দশ বছর ধরে। যারা গত ১৬ ও ১৭ মে আয়োজন করে—৮ম এনডিএফ বিডি জাতীয় বিতর্ক উত্সব ’১৪। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ পরিণত হয় বাংলাদেশে মেধাবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলায় ।
রাত শেষ হতেই ভোরের সূর্যের গোলাপী আভা যখন কেবল আকাশ ছুঁয়েছে তখনই কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে বাংলা একাডেমিতে। চলতে থাকে উত্সব প্রস্তুতি। সকাল ৮টা পেরোতেই ঢল নামে সারা দেশ থেকে আগত বিতার্কিকদের। রিপোর্টিংয়ের পর আইডি কার্ড, গিফট আইটেম সংগ্রহের পর উত্সবের টি-শার্ট আর ক্যাপ মাথায় তার্কিকরা তৈরি হয়ে যায় উত্সব র্যালির জন্য। রঙিন ব্যানারকে সামনে রেখে ‘চুরি যাওয়া কৈশোরে, ফিরবেই যুক্তির তুমুল যৌবন’ স্লোগানে ব্যান্ডের বাজনার সাথে সাথে শুরু হয় উত্সব র্যালি। বিভিন্ন ব্যানার আর রং-বেরঙের মুখোশ র্যালিটিকে বর্ণিল করে তোলে। প্রাণোচ্ছল র্যালিটি বাংলা একাডেমি থেকে শুরু হয়ে প্রেস ক্লাব হয়ে আবার বাংলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়।
সকাল ৯টায় বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান একেএম শোয়েব ও আন্তর্জাতিক বিতর্ক পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম তুষারসহ অনেকে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে বিতর্ক শিল্পে অবদানের জন্য বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. আবুল বারাকাতকে ‘এনডিএফ বিডি আজীবন সম্মাননা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। তিনি তার বক্তৃতায় বলেন, ‘বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী হয়ে অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় শিশু বিতর্ক। বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২য় ও ৩য় শ্রেণীর ৬ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে এই বিতর্কে। বিতর্কের বিষয় ছিল, ‘শিশুদের বিকাশে ডোরেমনের চেয়ে খেলার মাঠ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ বিতর্কের পক্ষ দলে ছিলেন সাদিকা তাসনিম অর্নিলা, ইভানা মান্নান ও সাদমান সাকিব নাবিল এবং বিপক্ষ দলে ছিলেন সাওমিত হাসান সাওম, মাহফুজ আহমেদ অনিক ও কায়নাত কারিন। নূর-ই-জান্নাতের প্রাণোচ্ছল সঞ্চালনায় শিশু বিতার্কিকদের এই বিতর্ক মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করে উত্সবে উপস্থিত সবাই।
শিশু বিতর্কের পরই শুরু হয় বিতর্ক কর্মশালা। বিতর্কে যুক্তি প্রদান, যুক্তি খণ্ডন ও বিতর্কের জন্য পড়াশোনা নিয়ে কর্মশালাটি পরিচালনা করেন জাতীয় টেলিভিশন বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন দলের দলনেতা ও বর্তমানে শেরপুর জেলার এডিসি এনডিএফ বিডি-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভাইজর রাজিব সরকার।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর শুরু হয় মিট দ্য পারসোনালিটি পর্ব। এ পর্বে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রভাষক অণিমা রায়, জনপ্রিয় নাট্যকার ও পরিচালক মাসুদ সেজান, সময়ের ব্যস্ততম গীতিকার ও উপস্থাপক তানভীর তারেক, তারুণ্যের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ব্ল্যাক-এর ড্রামার টনি, লাক্স তারকা ও উপস্থাপক আমব্রিন ও প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেত্রী নওশাবাসহ আরও কিছু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। তারা সেখানে তাদের সাফল্যের পেছনের কথা বলেন ও উপস্থিত বিতার্কিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ পর্বটি পরিচালনা করেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর ফিচার ইনচার্জ খালেদ আহমেদ।
এরপর শুরু হয় এনডিএফ বিডি ফরমেট বিতর্ক। রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হওয়া এ বিতর্কের বিষয় ছিল—‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনিরাপদ অভিবাসন মানব পাচারের প্রধান কারণ’। এরপর অনুষ্ঠিত হয় গ্লোবাল ডিবেট। বিকাল ৫টায় শুরু হয় ইংলিশ পার্লামেন্ট্রি ফরমেট ডিবেট। সন্ধ্যায় ধোঁয়া আর আঁধারে ঢাকা মঞ্চে একে একে হাজির হতে থাকে আত্মারা শুরু হয় প্ল্যানচ্যাট বিতর্ক। বিষয় :আমি ফিরে আসি বারে বারে। মঞ্চে একে একে আসেন হুমায়ূন আহমেদ, প্রিন্সেস ডায়না, মান্না দে, মাইকেল জ্যাকসন, ক্রস ফায়ারে মৃত একজন, লৌহ মানবী মার্গারেট থ্যাচার ও নায়ক মান্নার আত্মা। ভৌতিক পরিবেশে তাদের কথা শিহরণ জাগায় আগত সকল বিতার্কিকদের। সবার ভীতভাব কাটিয়ে আবারও উত্সব আনন্দে মাতিয়ে তুলতে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সারা বাংলাদেশ থেকে আগত বিতার্কিক আর আয়োজকদের অংশগ্রহণে সন্ধ্যার পর শুরু হয় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উপস্থাপিত হয় নাচ, গান, নাটিকা।
দ্বিতীয় দিনের আয়োজন শুরু হয় বিতর্ক কর্মশালার মধ্য দিয়ে। বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে কর্মশালাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও এনডিএফ বিডি মডারেটর ড. তানজিম উদ্দিন খান।
কর্মশালার শুরু হয় সংসদীয় ফরমেট বিতর্ক। বিতর্কের বিষয় ছিল : বিশ্বায়ন বাংলাদেশের কৃষি বৈচিত্র্যকে নষ্ট করছে। বিতর্কে স্পিকার হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশে কৃষি আন্দোলনের পুরোধা শাইখ সিরাজ। বিতর্কে তার্কিকরা বাংলাদেশের কৃষি বৈচিত্র্য, বিশ্বায়নের সাথে সাথে এই কৃষি বৈচিত্র্যের হুমকি ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। বিতর্ক শেষে শাইখ সিরাজ উত্সবে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর শুরু হয় ওয়ার্ল্ডস ফরমেট বিতর্ক। এরপর এনডিএফ বিডি-এর চেয়ারম্যান একেএম শোয়েবের অসাধারণ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় জুটি বিতর্ক। বিষয় ছিল ‘তোমরা যে বল দিবস রজনী, ভালোবাসা ভালোবাসা, ভালোবাসা কারে কয়...’। বিতর্কে উত্তম-সুচিত্রা, দেবদাস-পার্বতী ও অমিত-লাবণ্য জুটি অংশগ্রহণ করে। একটি জমজমাট রোমান্টিক বিতর্ক উপভোগ করে সবাই।
জুটি বিতর্ক শেষে শুরু হয় আঞ্চলিক বিতর্ক। বিতর্কের বিষয় ছিল ‘এই বাংলায় আমরাই সেরা’। বিতর্কে ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, রংপুর, সিলেট ও বগুড়ার অঞ্চলের বিতকার্কিরা অংশ নেন। তারা জানান দেন তাদের নিজ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠত্বের কথা। বিতর্কটি দারুণভাবে পরিচালনা করেন এনডিএফ বিডি-এর কো-চেয়ারম্যান এম আলমগীর।
শেষ বিকেলে শুরু হয় রম্য বিতর্ক। বিষয় ‘প্রেমের দেবতার চোখে আজ বেদনার জল।’ জাতীয় টেলিভিশন বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন দলের দলনেতা ও বর্তমানে শেরপুর জেলার এডিসি এনডিএফ বিডি-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভাইজর রাজিব সরকারের রম্য সঞ্চালনায় এবং তার্কিকদের হাস্যরসাত্মক কথায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাংলা একাডেমি মিলনায়তন।
রম্য বিতর্ক শেষে শুরু হয় সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সম্মানিত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এ্যামিরেটস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন পাবলিক সারভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ইকরাম হোসেন, দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসাইন, ফাস্ট করপোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাফিজ আহমেদ, উত্সবের প্রধান আহ্বায়ক মুসবাহ আহমেদ মাহদিসহ অনেকে। সকল অতিথিকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। এর পর শুরু হয় পুরস্কার বিতরণী পর্ব।
উত্সবে ইংলিশ পাবলিক স্পিকিং প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান অধিকার করে যথাক্রমে এনাম মেডিকেল কলেজের মালদ্বীপের শিক্ষার্থী জিয়াউল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শাকিলা আকতার, ফাউন্ডেশন স্কুলের সিনাত-ই-আফরোজা, আমেনা বাকি; রেসিডেন্সিয়াল মেডিকেল কলেজের মো. তাসমিউল হাসান ও মোহাম্মদ প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের তাসনুবা আহসান।
উত্সবে ঢাকার ভেতরে সেরা স্কুলের হিসেবে পুরস্কার পায় শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ, সেরা কলেজ হিসেবে ঢাকা ক্যান্ট গার্লস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেরা মেডিকেল কলেজ হিসেবে পপুলার মেডিকেল কলেজ, সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামি ইউনিভার্সিটি, সেরা মাদ্রাসা হিসেবে জান্নাতুল বানাত মহিলা মাদ্রাসা এবং ঢাকার বাইরে সেরা স্কুলের হিসেবে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেরা কলেজ হিসেবে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, সেরা মেডিকেল কলেজ হিসেবে হিসেবে এনাম মেডিকেল কলেজ এবং সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পুরস্কার পায় কুষ্টিয়া ইসলামি ইউনিভার্সিটি। পুরস্কৃত করা হয় সকল সংগঠককে।
এরপর আগত অতিথিরা উত্সবে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান করেন।
দু’দিনব্যাপী পুরো আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান একেএম শোয়েব। উত্সবের প্রধান পৃষ্ঠপোষকতাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল আননটেক্স ট্রাস্ট ফাউন্ডেশন এবং মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল চ্যানেল আই, দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি স্টার, রেডিও ফুর্তি ও বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম।
সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মঞ্চে একে একে উপস্থাপিত হয় নাচ, গান, নাটিকা। আস্তে আস্তে সমাপ্তি হয় ৮ম এনডিএফ বিডি জাতীয় বিতর্ক উত্সব ’১৪।
যুক্তির উচ্ছ্বাসে মুখরিত হওয়া দুটি দিন শেষে রাত জাগা তারার নিচে ফিরতে থাকা অনেকেই উপলব্ধি করছিল এপিজে আব্দুল কালামের কথাটি অনেক বেশি সত্য—‘স্বপ্ন সেটাই, যা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’, আর মনে উঁকি দিচ্ছিল এক টুকরো গোলাপী আকাশ—স্বপ্ন সত্য করার আনন্দ আর প্রত্যাশায় আবারও মেতে ওঠা হবে এমন আয়োজনে অন্য কোথাও...।
