আবাসিক এলাকা বলে কিছু কি থাকবে না

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ২২:১৮
রাজধানীতে আবাসিক এলাকা বলে কিছু থাকছে না। আবাসিক এলাকায় শিল্প স্থাপন আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় কোনোভাবেই অনুমোদনযোগ্য নয়। কিন্তু দেশে এসব দেখার বেশকিছু কর্তৃপক্ষ থাকলেও এবং দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকায় তারা বেতন ভোগ করলেও নিজেদের কর্তব্য পালনে তারা কতটা দায়িত্বশীল তা এক প্রশ্ন। রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতে ছোট-বড় প্রায় ৬০ হাজার শিল্পকারখানার অবস্থান প্রমাণ করে এ ক্ষেত্রের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনের বদলে মাসে মাসে বেতনভাতা এবং উেকাচ নেওয়াকে কর্তব্য বলে ভেবেছেন। সিটি করপোরেশনের ভূমিকাও এক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। স্থানীয় সরকার হিসেবে জনগণের এলাকাবাসীর স্বার্থরক্ষার বদলে কলকারখানার উদ্যোক্তা বা মালিকদের স্বার্থ রক্ষাকে তারা কর্তব্য বলে ভেবেছে বলেই মনে হচ্ছে। যে কারণে আবাসিক এলাকার লাখ লাখ মানুষকে জিম্মি করে শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি দিতে তাদের মধ্যে কোনো অনীহা দেখা যায়নি। ঢাকা সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় আড়াই লাখ ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। যার সিংহভাগই পুরনো ঢাকার আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। উপরন্তু রাজধানীর দশটি থানা এলাকায় কমপক্ষে ৫৫ হাজার অবৈধ কারখানা রয়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঢাকার প্রতিটি আবাসিক এলাকা একদিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যদিকে নানাপ্রকার কলকারখানায় ভারাক্রান্ত। কলকারখানাগুলোর শতকরা ৮৫ ভাগ রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক ভবন বা বাসাবাড়িতে অবস্থিত। এক শ্রেণির বাড়িওয়ালা বেশি ভাড়ার লোভে কলকারখানার উদ্যোক্তার কাছে বাড়িভাড়া দেন। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব কারখানার ভবনগুলো যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে বা অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। একটি মহানগরীতে আবাসিক এলাকা যেমন সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও অনুমোদন ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি কলকারখানা গড়ে তুলতেও প্রয়োজন হয় বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। কলকারখানা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র গ্রহণের বিধান রয়েছে। দমকল বিভাগেরও লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন ও তদারকির বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর আবাসিক এলাকায় এতসব কলকারখানা গড়ে উঠলো কীভাবে, এটা একটি বড় প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তলিয়ে দেখতে হবে। ঢাকা স্বাধীন দেশের রাজধানী হবার আগে বিকাশমান এই নগরীতে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন তত্কালীন ঢাকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই আমলের পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলো, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আগের সেই রূপ-বৈশিষ্ট্য আর ধরে রাখতে পারেনি। জনসংখ্যার চাপে পরিবর্তিত হয়েছে অনেক কিছু। সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা ও সরকারি নির্দেশনার অভাব এবং সেইসঙ্গে সরকারি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার সুযোগে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ছোট-বড় কলকারখানা। কারণ যথাযথ সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও অর্থনৈতিক চাপে বাণিজ্য ও শিল্প বসে থাকেনি। জনসংখ্যার চাপ নিয়ে রাজধানী ঢাকা আজ নানা ক্ষেত্রেই সমস্যার পাহাড়ে মুখোমুখি হয়ে আছে। সৃষ্টি হয়েছে দুর্বিষহ যানজট, পরিবেশদূষণসহ নানাবিধ সমস্যা। পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় নগরীর আবাসিক এলাকাগুলো বর্তমানের বিশৃঙ্খল চেহারা পেয়েছে। আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ এবং পরিবেশদূষণ যেমন নিশ্চিত হচ্ছে তেমন বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। দেশে মানুষের জীবনের চেয়ে যেভাবেই হোক অর্থ আয়ের বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ায় আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের অনৈতিক প্রবণতা রোধ করা যাচ্ছে না। এ কথা সবার জানা যে, প্রতিটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে শিল্পকারখানার জন্য পৃথক অঞ্চল নির্ধারিত রয়েছে। আমাদের দেশে দাবি করলেই রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলো রাতারাতি স্বপ্নের মতো সুন্দর কিংবা বিশৃঙ্খলা ও অবৈধ স্থাপনামুক্ত হবে—এমন আশা অযৌক্তিক। তবে রাজধানীর আবাসিক এলাকার পরিবেশ ও পরিকল্পিত আবাসন-বৈশিষ্ট্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে পারে। রাজধানীর আবাসিক এলাকায় এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিত যত কলকারখানা গড়ে উঠেছে, সেসবের পুনর্বাসন নিয়ে ভাবতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুদূরপ্রসারী সমন্বিত নগর-পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা