তীব্র তাপদাহ আর অসহ্য গরমের প্রভাব পড়েছে ঢাকা চিড়িয়াখানার প্রাণীকুলের ওপর। প্রচণ্ড গরমে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এ কারণে বদলে গেছে তাদের খাদ্য তালিকা। এখানকার ১৩৭ প্রজাতির ১ হাজার ৪১৫টি প্রাণীর খাদ্য তালিকায় বর্তমানে রাখা হচ্ছে খাবার স্যালাইন, ভিটামিন-সি, মৌসুমী ফল তরমুজ, আম, আনারস, শসা, সফেদা ও বাঙ্গি । আর বিশুদ্ধ শীতল পানি তো থাকছেই।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকা চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. এনায়েত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এপ্রিল, মে এবং জুন-এই তিন মাস গরমের সময় হিসাবে ধরা হয়। এ সময় চিড়িয়াখানার প্রাণীদের শীতল পানি সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্যালাইন এবং মৌসুমী কিছু ফলও দেয়া হয়। গরমে আমরা একটু বেশি তত্পর থাকি। ক্ষুদ্র এবং পাখি জাতীয় প্রাণীদের ভিটামিন-সিও সরবরাহ করি।
জানা গেছে, ঢাকা চিড়িয়াখানায় রয়েছে ১০ প্রজাতির ৪০টি মাংসাশী প্রাণী। তৃণভোজী প্রাণী আছে ২৩ প্রজাতির ২২১টি। ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ আছে ২৫ প্রজাতির ২৪৭টি। পাখি আছে ৫৬ প্রজাতির ১০৬টি। ফিস অ্যাকুরিয়ামে আছে ২৩ প্রজাতির ৮০১টি প্রাণী। কিন্তু তীব্র তাপদাহে অস্বস্তিতে আছে চিড়িয়াখানার এই প্রাণীকুল। তাই গরমে এদের জন্য নেয়া হয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা।
ঢাকা চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. নাজমুল হুদা বলেন, গরমে আমরা সতর্ক থাকি, যাতে করে প্রাণীদের স্বাস্থ্যের উপর কোন বিরূপ প্রভাব না পড়ে। এ সময় কোন প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিত্সা সেবা দেয়া হয় খুব সকালে অথবা পড়ন্ত বিকালে। গরমে খাদ্য তালিকায় মৌসুমভিত্তিক কিছু নতুন খাবার সংযুক্ত হয়। এটা খাবার সরবরাহের দরপত্রে শর্ত হিসাবে উল্লেখ থাকে।
সরেজমিনে চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখা গেছে, গরমে বেশিরভাগ প্রাণি খুঁজছে শীতল ছায়া। তাপদাহে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক ও হায়েনা। পাখিদেরও বেড়েছে অস্বস্তি। বিশেষ করে ম্যাকাউ, ইমু, ময়ূর, কেশোয়ারী, উটপাখি, হাড়গিলা, সাদা বক, চন্দনা, টিয়া, মদনটাক, গেটার ফ্লেমিং ও কালো গলার বকেরা অস্থির হয়ে পড়েছে। কেননা অন্যান্য প্রাণীর মতো এদের ঘাম নির্গমন পথ বা শরীরে ঘাম অপসারণের কোনো প্রক্রিয়া থাকে না। ফলে অনেক সময় এদের ‘হিটস্ট্রোক’ হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে তৃণভোজী বিশেষ করে জিরাফ, জলহস্তি ও হাতি এদের তেমন সমস্যা হয় না গরমে। সাদা হনুমান, কালো হনুমান, চিত্রা হরিণ, বানর, উল্লুক প্রভৃতি প্রাণীরও গরমে সমস্যা নেই। কারণ এরা খাদ্য হিসাবে শাকসবজি, ফলমূল, ঘাস, লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকে।
তবে গরমে কিছু সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে অজগর ও গোখরা সাপেরা অতিরিক্ত গরমে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে। গরমকালে এরা শরীরের খোলস পরিবর্তন করে। এ সময় অজগর ও গোখরা জাতীয় সাপের খাবার গ্রহণের প্রতি অনীহা দেখা দেয়। এরা সাধারণত ঠাণ্ডা গর্তে থাকতে ভালোবাসে। চিড়িয়াখানায় এদের খড় বা অন্যান্য উপাদান দিয়ে সেই ব্যবস্থা করা হয়।
ঢাকা চিড়িয়াখানার প্রাণী পুষ্টি কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. কামাল বলেন, অতিরিক্ত গরমে মাংসাশী ও নানা প্রজাতির পাখির বেশি সমস্যা হয়। এই সমস্যা নিরসনের একমাত্র পথ পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা। সবসময় দেখভাল করা। নিয়মিতভাবে চিকিত্সা দেয়া। আমরা এসব প্রাণীকে নিয়মিতভাবে বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে খাবার স্যালাইন দিয়ে থাকি।
গরমে চিড়িয়াখানার প্রাণীকূলের বাড়তি নিরাপত্তা ও পরিচর্যার ব্যাপারে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক শায়ের মাহমুদ ইবনে আলম বলেন, গরমে যে কারো বাড়তি পরিচর্যা দরকার। চিড়িয়াখানার প্রাণীদের জন্য তো আরো বেশি পরিচর্যা দরকার। এদের পানিযুক্ত খাবার বেশি দেয়া দরকার। এছাড়া পানি সরবরাহ নিয়মিত রাখতে হবে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদফতরসূত্রে জানা গেছে, ঢাকার তাপমাত্রা গত এক সপ্তাহে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উঠেছে। সহসা বৃষ্টি না হলে এই গরম অব্যাহত থাকবে। আবহাওয়া পূর্বাভাস কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদ জানান, পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে না। অনেক উপর দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণা বাতাসের সাথে পশ্চিমা বাতাসের সংযোগ হচ্ছে না বলে বৃষ্টি হচ্ছে না। তবে তিন-চার দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি হলেই তাপমাত্রা কমবে। আর তাই বৃষ্টিপাতের দিকে তাকিয়ে আছে চিড়িয়াখানার প্রাণীকুলও!
