থাই গণতন্ত্রের দুরবস্থা বনাম ক্ষয়িষ্ণু রাজতন্ত্র

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ০০:০৩
গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ১২ তম সামরিক অভ্যুত্থান দেশটিতে গণতন্ত্রের দুরবস্থা এবং রাজতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতি সবার সামনে উন্মোচন করেছে। সত্যি বলতে দেশটিতে গণতন্ত্রের গলা চেপে ধরা আছে সেই ২০০৬ সাল থেকে, যখন বিপুল জনপ্রিয় এবং একই সাথে বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এরপরও দেশটির গণতন্ত্র সব সময় সেনাবাহিনীর দয়ার পাত্র হিসেবে থেকেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নজরদারি করা পত্রিকা ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ থাইল্যান্ডে সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২২ মে ক্ষমতা দখলের দিন সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চ্যান-ওচা বিবদমান দুটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যকার আলোচনা সভায় টেবিলে হাত দিয়ে আঘাত করে যেভাবে চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমি ক্ষমতা দখল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি’ তাতে এটা পরিস্কার যে সেনাপ্রধান আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনেক রুষ্ঠ হয়ে ছিলেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এটা মিথ্যা নয় যে থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়ে একটানা বিবাদে জড়িয়ে ছিলেন। এতে সাধারণ জনগণের বড় অংশ চরম বিরক্ত হয়ে ছিল। অনেকে যেকোন মূল্যে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের উপায় খুঁজছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল যে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয় তা সবাই বুঝতে পারছেন। থাইল্যান্ডের মানুষ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এখান থেকেই শত্রুতার জন্ম। একদল গণতন্ত্রের পক্ষে। আরেকদল রাজতন্ত্রের পক্ষে। গণতন্ত্রের পক্ষ অবলম্বনকারীদের মধ্যে আবার দুটি ভাগ। একটি পক্ষ পল্লী এলাকার সাধারণ মানুষ, আরেকটি পক্ষ শহুরে অভিজাত শ্রেণী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়। এই শ্রেণীর ভোটার সংখ্যায় অনেক বেশি। একারণে ভোটের লড়াইয়ে থাকসিন কিংবা তার অনুসারীরাই জয় পেয়ে আসছে। অপরদিকে, শহুরে অভিজাত শ্রেণীদের বেশিরভাগ ডেমোক্র্যাট পার্টির সমর্থক। ভোটের লড়াইয়ে এরা থাকসিনপন্থিদের চেয়ে পিছিয়ে থাকে। যে কারণে তারা সংস্কারের দাবি তোলে। তাদের সংস্কারের দাবি আসলে থাকসিন ও তার বোন ইংলাক কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের রাজনীতি থেকে বাইরে রাখা। এজাতীয় সংস্কার প্রস্তাব ক্ষমতাসীনদের পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না। কারণ, তাদের জনপ্রিয়তা থাকসিন কিংবা তার পরিবার কেন্দ্রিক। সেটা না মানায় ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছিল না। ফলে নির্বাচন বয়কট করে বিরোধী দল। এই বয়কট থেকেই শুরু রাজনৈতিক হানাহানি ও রাজপথে রক্তপাত। এই সংঘাতের সুযোগে চক্ষু গরম করার সুযোগ পেয়ে যায় সেনাবাহিনী। এবারের অভ্যুত্থান থাই রাজতন্ত্রের দুর্বল অবস্থাও তুলে ধরেছে। কারণ ২০০৬ সালে থাকসিনকে ক্ষমতাচ্যুত করার সামরিক অভ্যুত্থানে রাজার সায় ছিল। কিন্তু এবার রাজাকে কিছুই জানানো হয়নি অভ্যুত্থানের বিষয়ে। এমনকি রাজার কাছে এই অভ্যুত্থানের বৈধতাও চায়নি সেনাবাহিনী। বিষয়টি থেকে রাজতন্ত্রের সঙ্গে সেনাবাহিনীর দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টাও অনেকের চোখ এড়াতে পারেনি। সুতরাং সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজতন্ত্রপন্থি এবং রাজতন্ত্রবিরোধীদের মধ্যে যে অদূর ভবিষ্যতে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে না সেটা হলফ করে বলা সম্ভব নয়। বর্তমান রাজার আমলে যারা সমৃদ্ধশালী হয়েছেন তাদের অনেকে সেনাবাহিনীর চক্ষুশূলও হয়ে পড়তে পারেন। তাই পরিস্থিতির দিকে আপাতত নজর রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই।