বাংলাদেশে জনজীবন

আপডেট : ২৬ মে ২০১৯, ২১:৫৪

বাংলাদেশে জনজীবনের অবস্থা নিয়ে এদেশের সরকার ধনিক-বণিকেরা, বিশিষ্ট নাগরিকেরা ও রাজনীতিবিদেরা কেবল নিজেদের স্বার্থে যতটা দরকার ততটাই চিন্তা করেন। তাঁরা জনসাধারণকে রক্ষা করেন কেবল নিজেদের প্রয়োজনে, জনগণের দিক থেকে জনগণকে দেখেন না। জনগণের মধ্যেও আত্মসচেতনতা, আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মশক্তির উপলব্ধি এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চিন্তা ও চেষ্টা নেই। জনগণের (of the people by the people for the people) কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব নেই। বাইরের সাম্রাজ্যবাদী মহল ও বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে— বাংলাদেশের জনগণকে— তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে এখন যা কিছু চলছে তাতে রাজনীতি নেই— বাংলাদেশ এখন নিঃরাজনীতিকৃত। গত সাতচল্লিশ বছরে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি গড়ে উঠেছে? রাষ্ট্র কী?

বাংলাভাষার দেশে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, বেগম রোকেয়া, কাজী আব্দুল ওদুদ, কবি নজরুল প্রমুখের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল এক রেনেসাঁস। তার ধারাবাহিকতায় বঙ্গ-ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের (১৯০৫-১১) সময়ে দেখা দিয়েছিল রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণজাগরণ। আন্দোলনের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন সুবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষচন্দ্র বসু, এ কে ফজলুল হক, আবুদল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ নেতা। এরই মধ্যে ঘটেছে ব্রিটিশ শাসকের অবসান, জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে গণজাগণের ধারায় চলে দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন; কিন্তু পরবর্তী সামরিক শাসন গণজাগরণের ধারাকে অব্যাহত রাখেনি।  ফজলুল হক, ভাসানী ও জাসদের রাজনীতির কোনো ধারবাহিকতা নেই। মার্কবাদী ধারার কোনো অগ্রগতিই নেই। এর মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে এনজিও ও সিএসও (সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশন)। ১৯৮০-র দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি ও প্রকৃতি নির্ধারণে এনজিও ও সিএসওর রয়েছে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এ সবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হয়ে পড়েছে নিঃরাজনীতিকৃত এবং গণজাগরণ লোপ পেয়েছে। ১৯৮০-র দশকের সরকার উত্খাতের আন্দোলনে গণজাগরণের বৈশিষ্ট্য ছিল না, ছিল হুজুগের সব  বৈশিষ্ট্য। এ সবের মধ্যে জনজীবনে চলছে চরম দুর্গতি।

ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ ১৯৯১ পর্যন্ত কালে পর্যায়ক্রমে দুনিয়াব্যাপী গিয়েছে গণজাগরণের ও প্রগতির কাল। এর মধ্যে গিয়েছে উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ, দুই বিশ্বযুদ্ধ। মার্কসবাদ অবলম্বন করে সভ্যতার সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা ছিল; কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপের পর সে ধারার অবসান ঘটেছে। তাতে সভ্যতার সংকট ঘণীভূত রূপ নিয়ে সামনে এগোচ্ছে। মানব জাতি এখন কি সভ্যতার ধারা ধরে চলছে? না বর্বরতার?

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনজীবনে চলছে চরম দুর্গতি। গতানুগতিক রাজনীতি ও কথিত সুশাসনের প্রচেষ্টা ছাড়া সংকটের অবসান ঘটানো যাবে না। এতে সংকট বাড়ছে এবং বাড়বে।

সংকটের দিকটা একটু দেখা যাক। রাজনীতিতে রাজনীতি নেই। যা আছে তা রাষ্ট্রে ও জাতি গঠনের পরিপন্থি জনজীবনের সমস্যাবলির প্রতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি এতটাই আছে যতটা তাদের নিজেদের স্বার্থে দরকার। রাজধানী ঢাকায় জনজীবন দুর্গত— বসবাসের অযোগ্য। এখন দূষিত পানি নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রকৃতপক্ষে কেবল পানি কেন, সবই দূষিত। চলাচল দুষ্কর নারী-পুরুষ সম্পর্ক, পরিবার-ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে. পুনর্গঠন নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। কেবল শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধানের উপায় নিদের্শ করা হচ্ছে। সর্বত্র অপসংস্কৃতির চর্চা চলছে। বাংলাদেশে সংস্কৃতি এক হারানো প্রত্যয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন অনেক লোক প্রাণ হারাচ্ছে। আইনগত সমাপ্তি ছাড়া সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব করা হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে র্যাব, পুলিশ সন্দেহভাজন লোকদের বিনাবিচারে হত্যা করে চলছে। সরকারি অফিসাদিতে দুর্নীতি ক্রমবর্ধমান। কেবল দুর্নীতি দমন কমিশন ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দ্বারা সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের অনেক লোক সমাজের স্তরে স্তরে জুলুম-জবরদস্তি চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা গণবিরোধী ও দুর্গত। চিকিত্সাব্যবস্থা দুর্গত। জনস্বাস্থ্য অবহেলিত। বেকার সমস্যাও ভয়াবহ। ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, পঙ্গু বাড়ছে। রাষ্ট্রের, জাতির ও জনজীবনের অবস্থা দেখে লোকে বলে— ‘সারা অঙ্গে ঘা, মলম দেব কোথা।’ জনজীবন এতটাই দুর্গত যে, এই অবস্থার বর্ণনা দেওয়ার মতো ভাষা আমার নেই। বাংলাদেশের জনগণ সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে এখন জনগোষ্ঠীগত অবক্ষয়ের মধ্যে পড়ে গেছে।

লোকে অস্তিত্বের ও আর্থিক উন্নতির আশায় প্রাণপণে পরিশ্রম করছে। তার ফলে কৃষি উত্পাদন অনেক বেড়েছে এবং অব্যাহত গতিতে চলছে। শিল্প কারখানার শ্রমিকেরা প্রাণপণে কাজ করছে এবং উত্পাদন চালিয়ে যাচ্ছে। পোশাক শিল্পে প্রধানত নারী শ্রমিকদের শ্রমে উত্পাদন হচ্ছে, তাতে আমাদের জীবিকার সংস্থান হচ্ছে, সরকারের আয় হচ্ছে। বিদেশে শ্রমিকরা গিয়ে আয় করছে— তাতে তাদের পরিবার সচ্ছলতা অর্জনের চেষ্টা করছে, সরকারেরও আয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ন্যাটো বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ ও যুদ্ধ চালাচ্ছে, তার সহায়তায় এবং আরব জাতিগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামকে দমন করার কাজে বাংলাদেশ কথিত আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনীতে সৈন্য পাঠাচ্ছে। তাতে এই সৈন্যদের পরিবারের ও সরকারের আয় হচ্ছে। বাংলাদেশে সরকার এখন আগের তুলনায় অনেক ধনী। সরকার রাস্তাঘাট, সেতু, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দালানকোঠা ইত্যাদি নির্মাণ করছে। জনমনে ধারণা আছে যে, এসব কাজে সীমাহীন দুর্নীতি চলছে। সরকারি লোকদের এবং সরকারি দলের লোকদের নৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জনমনে ভালো ধারণা নেই। লোকে বলাবলি করে যে, দেশে আর্থিক দুর্নীতি চলছে। সরকার অবশ্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে আগের তুলনায় আরো বেশি সক্রিয় করেছে। প্রশ্ন হলো— সমস্যা কি কেবল শাস্তি দিয়ে সমাধান করা যাবে? দেশের লেখক, শিল্পী, চিন্তাবিদ, গবেষক— প্রায় সবাই সিএসওতে নিয়োজিত হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা হারিয়ে ফেলেছেন। সরকার ও রাজনীতিবিদেরা সিএসওর বিশিষ্ট নাগরিকেরা যেসব পরামর্শ দিয়ে আসছেন তা দ্বারা রাজনীতির ও জনজীবনের উন্নয়ন, কোনো পক্ষেই দেখা যাচ্ছে না। প্রধানত তাদের কার্যকলাপের ফলেই বাংলাদেশ এখন নিঃরাজনীতিকৃত। আমার মনে হয় না যে, সিএসওর বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ বাংলাদেশের রাজনীতির ও জনজীবনের উন্নতিতে কোনো কাজে লাগছে।

যেসব সমস্যার কথা এখানে উল্লেখ করলাম সেগুলোর বাইরে আরো অনেক সমস্যা আছে। প্রতিবছর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত অগণিত।

এসব সমস্যার সমাধানের জন্য সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো মানবাধিকার সংরক্ষণে ও সুশাসনে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রতিদিনই এসব বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে তারা সরকারের উপর ও প্রশাসনের উপর চাপ দিচ্ছে। তাতে কোনো ফল হচ্ছে না। সরকারের উপর তারা চাপ সৃষ্টি করেছে পুলিশি ব্যবস্থা ও জেল-ফাঁসি দিয়ে সমস্যার সমাধান করার জন্য। তাদের প্রচারের ফলে জনমনে ধারণা হচ্ছে যে, সরকার দিয়ে, রাজনীতিবিদদের দিয়ে কোনো সুফল হবে না। সরকার জেল-ফাঁসি দিচ্ছে না। সুতরাং সামাজিক আন্দোলন দিয়ে সমস্যাটির সমাধান করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন দিয়ে কীভাবে সমস্যাবলির সমাধান হবে, সে কথা তারা স্পষ্ট করে বলছে না কিংবা বলতে পারছে না। আমার ধারণা, সিএসওরা যে সমাধান দেখাচ্ছে তা দ্বারা সমাধান হবে না। তাতে সরকার, রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি দুর্বল হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের কর্তৃত্ব বাড়ছে। জাতি নিঃরাজনীতিকৃত হয়ে পড়েছে।

সমাধান তা হলে কীভাবে হবে? সিভিল সোসাইটি অরাজনৈতিক উপায়ে সামাজিক আন্দোলন দ্বারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার, দুর্নীতি দমনে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনের দ্বারা সমস্যার সমাধানের উপর নির্দেশ করে চলছে। অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ, সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথাও ক্রমাগত প্রচার করে আসছে। সরকারের বাইরে যেসব রাজনৈতিক দল আছে সেগুলোও সিভিল সোসাইটি মহলে বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে চলছে। এতে কোনো সুফল হচ্ছে না, হবে না।

রাজনীতির উন্নতির জন্য উন্নত চরিত্রের নতুন রাজনীতি লাগবে। উন্নত চরিত্রের নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে। তার জন্য নতুন রাজনীতির সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক দল ও নতুন নেতৃত্ব লাগবে। রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই জনসম্পৃক্ত হতে হবে। দূতাবাসমুখী রাজনীতি, ওয়াশিংটনমুখী রাজনীতি বর্জন করতে হবে।

নতুন উন্নত রাজনীতির জন্য স্বতন্ত্র নতুন চিন্তা ও কাজের ধারা সৃষ্টি করতে হবে। সেই ধারার আলোচনা সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক দরকার। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শুদ্ধতার দিকে এগোতে হবে। দীর্ঘ সাধনা ও সংগ্রাম লাগবে। তার জন্য গতানুগতিকতা ত্যাগ করে প্রগতি লাগবে।

n লেখক :প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়