গ্রীষ্মের ছুটি চলছে সবখানে।
স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রখর রৌদ্র তাপের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি চললেও ছুটি নেই মায়েদের। সারাবছর সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ততা থাকলেও ছুটির সময়েও এই ব্যস্ততা কমে না বিন্দুমাত্র, বরং বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ছুটির দিনের এই সময়গুলোতে সন্তানদের নিয়ে মায়েদের যত পরিকল্পনা নিয়ে থাকছে এবারের আয়োজন। লিখেছেন— সাইদুর রহমান খান
শারমিন আলী। পেশায় একজন গৃহিণী। সন্তানদের নিয়ে ভাবতে ভাবতে আর সাংসারিক কাজকর্ম করতে করতেই কেটে যায় সারাদিন। দুই সন্তান সারা আর মিতু। পড়ে ভিকারুননিসা স্কুলে। গ্রীষ্মের এই ছুটির মাঝেই তিনি মেয়েদেরকে কারাতে শেখাতে চান দুই মেয়েকে। শারমিনের সাথে এই বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, বর্তমান সময়ে মেয়েদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় প্রায়ই। স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হলেই রাজ্যের নানা দুশ্চিন্তা এসে ভর করে মাথায়। বার বার ঘড়ি দেখি। ওরা ঠিকমত বাসায় এসে পৌঁছলেই তবে শান্তি পাই। তাই চিন্তা করেছি এই গ্রীষ্মের ছুটিতে ওদের দু’জনকেই কারাতে শেখাবো। আর কিছু না হোক অন্তত প্রয়োজনের সময় যাতে নিজেদের অন্তত আত্মরক্ষা করতে পারে। আর তাই সময় হিসেবে এই গ্রীষ্মের সময়টাকেই বেছে নিয়েছি। প্রয়োজনীয় কিছু আত্মরক্ষার কৌশল শেখা থাকলে নিজেদের আত্মরক্ষা করাটা যেমন সহজ তেমনি এতে করে আত্মবিশ্বাসও অনেক বৃদ্ধি পায়।
আরেক গৃহিণী নাসরীন সুলতানা জানান, এই গরমের ছুটিটায় ছেলে-মেয়েদেরকে সাঁতার শেখাবেন তিনি। একটাই সন্তান তার। পড়ে সবেমাত্র ক্লাস এইটে। গ্রামের বাড়ি বরিশাল হলেও সাঁতার জানে না একরত্তিও। প্রতিবার ঈদের সময় যখন গ্রামের বাড়ি যান তখন মনে মনে ভয়ে কাঁপতে থাকেন তিনি। যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে তখন কী হবে এই ভেবেই সর্বদা তটস্থ থাকতে হয়। বাচ্চারা গ্রামে গেলে স্বভাবতই একা একা ঘুরতে পছন্দ করে। নাসরীন জানান, একা কোথাও যেতে দিতে চাই না ওকে। কখনো খুব মন খারাপ করে। কিছু বললেও শুনতে চায় না। তাই ঠিক করেছি এবারের ছুটিতে ওকে সাঁতার শেখাবো। সাঁতার শেখাটা খুবই জরুরি কিন্তু শহরের আমাদের ছেলে-মেয়েদের অনেকেই সাঁতার জানে না, যার ফলে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। তিনি আরও জানান যে, এইতো মাত্র কয়েকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কতগুলো শিক্ষার্থী শুধুমাত্র সাঁতার না জানার কারণে সমুদ্রে ডুবে মারা গেল, ভাবতেই শরীরটা শিউরে ওঠে। তাই এবারের ছুটিটায় ওকে সাঁতার শেখাবো। তবে স্কুল শিক্ষিকা মুনিরা চৌধুরী জানান, এবারের ছুটিটা তিনি ব্যয় করবেন মেয়েকে সাইকেল চালানো শেখাতে। একটি মাত্র মেয়ে তার। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি বলেন, আমি আমার মেয়েকে একজন নারী হিসেবে নয় সবসময়ই দেখি একজন মানুষ হিসেবে। শুধুমাত্র পড়ালেখার গণ্ডিতেই নিজেকে বেঁধে ফেললে কখনোই ভালো কিছু করা সম্ভব নয়, তাই আমার মেয়েকে আমি নাচ, গানের পাশাপাশি ওকে আমি সমসাময়িক সবকিছুর সাথেই পরিচিত করে তুলতে চাই। আজ নারী সম্পর্কে মানুষের ধারণা অনেক বদলেছে। আজ শহরের রাস্তায় আমি যখন দেখি যে, একঝাঁক তরুণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একদল তরুণীও পাশাপাশি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে তখন আমার খুব ভালো লাগে। আমাদের সময় তো এসব কল্পনাও করা যেত না। এখন সময় বদলেছে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, তাছাড়া সাইকেল পরিবেশবান্ধবও। আমার মতে, সাইকেল চালানো একটি ভালো অভ্যাসও বটে, আর তাই আমার মেয়েকে আমি একটা ভাল অভ্যাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই এই ছুটিতে।
কিন্তু সাদিয়া আরমানের ইচ্ছা এই ছুটিটা তিনি কাজে লাগাবেন ঘোরাঘুরি করে। সাদিয়া বলেন, আমার স্বামী এবং আমি দু’জনই একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করি। পেশাগত কারণে প্রায়ই বাসায় ফিরতে দেরি হয়। বাচ্চাটাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারি না। তাই ঠিক করেছি এবারে ওর স্কুলের ছুটির সাথে মিলিয়ে ছুটি নেব। তারপর কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসবো গ্রামের বাড়ি থেকে। ব্যস্ততার কারণে অনেকদিন মা বাবার সাথেও দেখা হয় না। এবারে সেই ইচ্ছেটাও পূরণ করবো। ইতোমধ্যেই অফিসে ছুটির জন্য আবেদন করেছি। ছুটি পেলেই আর দেরি করবো না। এসময় তিনি আরো জানান, আশা করছি পরিবার- পরিজন নিয়ে এবারের ছুটিটা বেশ ভালোই কাটবে।
কৃতজ্ঞতা: শ্যামা শারমিন রহমান
