পাহাড় জয়ের গল্প

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২০:২৫
দেখতে দেখতে চার বছর হয়ে গেল বাংলাদেশের এভারেস্ট জয়ের গল্প। আর এই জয়ের সাথে যে নামটি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় মুসা ইব্রাহীম। এভারেস্ট একাডেমি এবং রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত হয় চার বছর পূর্তি উত্সব। এই উত্সব নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার বিকেলটা ছিল জলপাই রোদে মোড়ানো আনন্দময়। রাজধানীর রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র মিলনায়তনে তখন সবে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের এভারেস্ট জয়ের চার বছর পূর্তি উত্সব। দর্শকের সারি পরিপূর্ণ এবং সবাই আগ্রহ ভরে শুনছে এভারেস্ট জয়ী মুসার কথা। শুরুতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে মুসা ইব্রাহীম তার এভারেস্ট অভিযানের সব পর্যায়ের আলোকচিত্র দেখান এবং সেগুলোর বর্ণনা দেন। ২০১০ সালের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করেন তিনি। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। আরও উপস্থিত ছিলেন মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট অভিযানের সহ-অভিযাত্রী নেপালবাসী লাল বাহাদুর জিরেল, বাংলাদেশ বিমানের ক্যাপ্টেন এনাম তালুকদার, ঢাকাস্থ রুশ দূতাবাসের সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান ও ফার্স্ট সেক্রেটারি আলেক্সান্ডার পি. ডেনিম, আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড লাভ, নন্দিত নির্মাতা ও অভিনেতা তৌকীর আহমেদ, ‘আমাদের গ্রাম’-এর পরিচালক রেজা সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপের মহাসচিব শিশির শীল, নর্থ আলপাইন ক্লাবের সহ-সভাপতি পল্লব মোহাইমেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে গওহর রিজভী বলেন, ‘এভারেস্ট জয় করে মুসা ইব্রাহীম ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। সেখান থেকে তাকে সরানো যাবে না। মুসার পরে যারা এভারেস্ট জয় করেছেন, তাদেরও অভিনন্দন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম যখন মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট বিজয়ের সংবাদ শুনেছিলাম, একই সঙ্গে গর্ব ও বিস্ময় অনুভব করেছিলাম। কোনো দিনও ভাবিনি কোনো বঙ্গসন্তান এভারেস্ট বিজয় করবে। মুসা ইব্রাহীম সেটা সম্ভব করেছেন।’ মুসার এভারেস্ট বিজয়ের সহ-অভিযাত্রী নেপালবাসী লাল বাহাদুর জিরেল ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলেন, ‘আমি শুনেছি মুসার এভারেস্ট বিজয় নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। স্পষ্টভাবে বলছি, আমি নিজের চোখে দেখেছি মুসা এভারেস্ট জয় করেছেন।’ প্রথম এভারেস্ট বিজয় নিয়ে সব সংশয় কাটিয়ে ওঠার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আই লাভ বাঙালি, আই লাভ বাংলাদেশ।’ অনুষ্ঠানে মুসা ইব্রাহীম মঞ্চে এসে বলেন, ‘আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের বিনিময়ে যে লাল সবুজ পতাকা অর্জন করেছি, সেই পতাকা পৃথিবীর উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পেরেছি। এটা শুধু আমার না, সারা বাংলাদেশের গৌরব। আমরা ভবিষ্যতে আরও উঁচুতে তুলে ধরব আমাদের প্রিয় পতাকা, প্রিয় বাংলাদেশ। এভারেস্টে লাল সবুজ পতাকা ওড়ানোর পর বাংলাদেশ বিশ্বে ৬৭তম এভারেস্টজয়ী দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন আসিফ এন্তাজ রবি। আলোচনার পর অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে এভারেস্ট বিজয়ের চার বছর উদযাপন করেন। এ উপলক্ষে রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট অভিযানের সপ্তাহব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। প্রদর্শনীতে মোট ৩৪টি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। এই প্রদর্শনী প্রতিদিন সকল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সাধারণের জন্য তা উন্মুক্ত থাকবে। প্রজন্মের পাঠকদের জন্য আমরা মুসা ইব্রাহীম কাছে কিছুটা সময় চেয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত সময়। প্রথমেই তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম পর্বতারোহণের সময় কোনো বিপজ্জনক মুহূর্তের স্মৃতি সম্পর্কে। জবাবে মুসা বলেন, ‘এভারেস্ট অভিযানের সময় প্রায় ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় সেকেন্ড স্টেপ পার হওয়ার সময় অক্সিজেন টিউব ফুটো হয়ে যাওয়া। ফলে একসময় মনে হচ্ছিল যে অক্সিজেনের অভাবে বুক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আর এভারেস্ট জয় করে নেমে আসার সময় হাইপোক্সিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় এভারেস্ট রিজে চলার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলা। মহান আল্লাহ সহায় ছিলেন বলেই সেদিন বেঁচে গেছি।’ পর্বতারোহণকে বাংলাদেশে পেশা হিসেবে নেওয়ার পুরোপুরি সুযোগ রয়েছে বলে জানালেন মুসা। কিন্তু এরজন্য নিজেকে প্রস্তুত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের যারা এই সেক্টরে ভালো করছে তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘পর্বতারোহণ যারা করেন, এটা কোনো প্রতিযোগিতামূলক বিষয় নয় যে, এখানে মূল্যায়ন করা যায় বা সুযোগ আছে। বরং যারা পর্বতারোহণ করছেন বা করতে চাইছেন, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই—পর্বতারোহণ ব্যক্তিকে নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে একেবারে স্পষ্ট ধারণা যেহেতু দিতে পারে, সুতরাং নিজেকে চেনার জন্য পর্বতারোহণ করতে গেলে একান্ত আগ্রহ নিয়েই সেটা করা উচিত। সেই সাথে নতুনদের পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত।’ মুসা ইব্রাহীম খুব শিগগিরই আমেরিকায় যাবেন সেখানকার কিছু পর্বতে উঠতে। পর্বতারোহণ করতে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়, একজন বাংলাদেশি হিসেবে এটা কি একটি বিলাসিতার বিষয় বলে মনে করেন? না হলে কেন প্রয়োজনীয়? উত্তরে মুসা ইব্রাহীম বলেন, ‘বিশ্বে যতগুলো খেলাধুলায় সর্বোচ্চমাত্রায় ঝুঁকি আছে, তার মধ্যে পর্বতারোহণে ঝুঁকি রয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই ঝুঁকির চ্যালেঞ্জ পার হয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোটা হলো সবকিছুর ওপরে ব্যক্তির ইচ্ছা ও সামর্থ্যকে প্রমাণের সবচেয়ে বড় জায়গা। সেদিক থেকে পর্বতারোহণে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তার তুলনায় অর্জনটা এক মহান উচ্চতায় আসীন। সবকিছু অর্থের মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য নয়। এই অর্জনটাও তেমনি। বাংলাদেশি হিসেবে পর্বতারোহণ করাটা কোনো বিলাসিতা নয়। বরং বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও যে একটা লক্ষ্য অর্জন করা যায়, টার্গেটে পৌঁছানো যায়, এটা তারই প্রমাণ এবং এটা বিশ্বজনীন।’