সাহসী একজন

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২০:২৬
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বেশিরভাগ শিক্ষা তিনি নিয়েছেন জীবন থেকে। একজন সফল মানুষ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে তার প্রচেষ্টা ছিল নিরন্তর। সময়ের একটি সাহসী উদ্যোগই পরর্বতীতে পাল্টে দেয় তার জীবনের গতিপথ। এই উদ্যোগটির নাম ‘সাহস’। নামের গভীরতার কারণে সাহসের যাবতীয় ভাবনা, কাজ আর স্বপ্ন অনেক সুন্দর, বিশাল আর ব্যতিক্রমধর্মী। সাহসের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক নাজমুল হুদা রতনের গল্প নিয়ে আমাদের এ আয়োজন। লেখালেখির জগতে তিনি ‘সাহস রতন’ নামেই বেশি পরিচিত। তার বেড়ে উঠার গল্প ও সাহসী উদ্যোগ নিয়ে লিখেছেন আহসান রনি ও ছবি তুলেছেন ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি তার ছোটবেলা কেটেছে গ্রামে। জন্মস্থান সিংগুরে। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে পরিবারে তার অবস্থান দ্বিতীয়। তার বাবা সামছুল হুদা ছিলেন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, সমাজকর্মী, সক্রিয় রাজনীতিবিদ। মা হোসনে আরা হুদা ছিলেন গৃহিণী। বাবা শিক্ষকতার কারণে অন্যত্র থাকতেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বাড়ি আসতেন। তবে সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত থাকার কারণে অসম্ভব ব্যস্ত থাকতেন। ছেলেমেয়েদের সাথে কথা হতো কদাচিত। মা-ই তাদের দেখাশোনা করতেন। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনাতে ছিলেন একেবারে সাধারণ। ছোট থেকেই পাঠ্য বই পড়তে ভালো লাগত না তার। তবে বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যের বইয়ের গল্পগুলো ভীষণ প্রিয় ছিল তার। হঠাত্ করেই পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন। ক্লাস নাইন-টেনে সবাইকে পেছনে ফেলে রোল বানিয়ে ফেললেন এক। ১৯৭৮ সালে ঝলম হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন ১ম বিভাগে। এইচএসসি পরীক্ষা দেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে। সেটিতেও ১ম বিভাগ। এরপর ১ বছর ব্রেক অব স্টাডি। ১৯৮৬ সালে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে সিভিল ডিপ্লোমা করেন। সেখানে পান ১ম বিভাগ। ১৯৯৮ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসএস ডিগ্রি নেন। পিপলস ইউনিভার্সিটিতে প্রফেশনাল এমবিএ-তে ভর্তি হন ২০০০ সালে। ৬০ ক্রেডিটের মধ্যে ২৮ ক্রেডিট সম্পন্ন করার পর আবার ব্রেক অব স্টাডি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট থেকে তুর্কি ভাষায় ডিপ্লোমাও করেছেন তিনি। প্রথম কাজ শুরু করেন একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে, যারা কৃষি বিভাগের অধীনে গভীর নলকূপ বসানোর কাজ করত। এরপর হুন্দাই কর্পোরেশনসহ কয়েক জায়গায় কাজ করে সব শেষ ওয়াই কে কে জিপার্স কোম্পানিতে কাজ করেন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। কিশোর বয়সে অকালে বাবাকে হারালেন। বাবাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার অবর্তমানে জীবনের রূঢ় ও বাস্তব দিকগুলো দ্রুত সামনে চলে এলো। সেগুলো দেখে দেখেই অনেক কিছু শিখেছেন তিনি। ওয়াই কে কে জিপার্সে কর্মরত অবস্থায়ই প্রথম গ্রামে কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় আসে তার। মূলত পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই কোনো কিছু করার তাগিদা অনুভব করেন। এক্ষেত্রে তার পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা না বললেই নয়। তার পরিবার সিংগুর গ্রামে বসত গড়েছিল প্রায় ১৫০ বছর আগে। তার দাদা আব্দুল হামিদ মাস্টার উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এন্ট্রান্স পাস করেন। তাদের এলাকায় তিনিই প্রথম মুসলমান যিনি এন্ট্রান্স পাস করেন। তার দাদা একনাগারে ২২ বছর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এরপর দাদার প্রথম সন্তান, তার বাবা, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। মৃত্যুকালীন সময়ে তিনি ছিলেন কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলাস্থ মিয়াবাজার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পারিবারিক ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতাতেই রতন গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেন। তার স্বপ্ন ছিল আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। পাশাপাশি এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যা হবে অন্য সবার চেয়ে আলাদা, সুন্দর আর ব্যতিক্রমধর্মী। যার কারণে তিনি ইংরেজি মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম সাহস। যার স্লোগান হলো, স্বাবলম্বী হবো সবাই। সাহস দক্ষ জনশক্তি উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান। নামের গভীরতার কারণে সাহসের যাবতীয় ভাবনা, কাজ আর স্বপ্ন অনেক সুন্দর, বিশাল আর ব্যতিক্রমধর্মী। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন একাই। প্রথমেই পরিবার থেকে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। কারণ যে স্বপ্ন আর প্রকল্প নিয়ে তিনি পরিবারের সবার সাথে কথা বলেছেন তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর রতনের অর্থনৈতিক অবস্থা কখনোই এমন ছিল না যে এমন একটি বিশাল উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবা যায়। ফলে পরিবারের সবাই সবসময়ই বাধা দিয়েছেন। কারণ তিনি দেখছেন, সাহস নামের প্রতিষ্ঠানটির কাজগুলো চলমান রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত তাকে জমি বিক্রি করতে হচ্ছে। তারপরও তিনি এই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন যে, একদিন এই প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। তিনি নিজ উদ্যোগেই সাহস নামের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর আওতায় সাহস ইনটেলেক্ট ডেভেলপমেন্ট স্কুল, সাহস লাইব্রেরি, সাহস পাবলিকেশন্স, সাহস ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড (পর্যটন অবকাঠামো), সাহস কথা (অনিয়মিত পত্রিকা) কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া, নিজ উদ্যোগে ঝলম বাজারে পাবলিক টয়টেল স্থাপন, ঝলম ঈদগাহ মাঠের অবকাঠামো উন্নয়ন, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেড নির্মাণ, সোনারগাঁও, ফার্মগেট ও বিজয়সরণি সিগনাল পয়েন্টে ট্রাফিক সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করেছেন দেশপ্রেমী এই মানুষটি। প্রকাশনায় সার্বিক অবদানের জন্য তিনি পদক্ষেপ পুরস্কার ২০১২ লাভ করেন। তার সমস্ত ভাবনা-চিন্তা-কাজ সাহসকে ঘিরে আবর্তিত। ভবিষ্যতে সময়, সুযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেলে তার উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে সাহস ইনটেলেক্ট ডেভেলপমেন্ট স্কুলের মডেলে একটি করে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চান এই উদ্যোক্তা। মেয়ে মালিহা বিনতে হুদা এবার এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছেলে ফাহিম মুনকাসির হুদা বর্তমানে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ক্লাস সিক্সে অধ্যয়নরত। স্ত্রী মনোয়ারা সুলতানা নাছিমা সাহসের চেয়ারম্যান। তবে বাচ্চাদের দেখাশোনাই মূল দায়িত্ব। রতনের পরিবারই তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা করেন তার সন্তানেরা পড়াশোনা শেষ করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। নাজমুল হুদা রতন জন্ম তারিখ ও স্থান :১১মে, কুমিল্লা মায়ের নাম :হোসনে আরা হুদা (মৃত) বাবার নাম :সামছুল হুদা (মৃত) প্রথম স্কুল :ঝলম প্রাইমারি স্কুল প্রিয় মানুষ :বাবা প্রিয় উক্তি :আমরা সবাই মিলে অসম্ভব সুন্দর একটা কিছু ঘটিয়ে দেবো। অবসর যেভাবে কাটে :লেখালেখি, বই পড়া আর বেড়ানো। সাফল্যের সংজ্ঞা :সততার সাথে আন্তরিকভাবে নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম।