বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য আমাদেরকে নিজেদের রিসোর্স ব্যবহার করতে হবে। নিজেদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতেই এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের পেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায় হতে পারে সবুজ আন্দোলন। সহজভাবে বললে, সবুজ আন্দোলন বলতে বোঝায় সারা বাংলাদেশকে সবুজে রূপান্তরিত করার জন্য বৃক্ষরোপণ করা। এই আন্দোলনের নাম দেওয়া যেতে পারে ‘গ্রীন মুভমেন্ট অব বাংলাদেশ’ বা সবুজ আন্দোলন। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের চেয়ে আর কোনো সহজ ও সর্বোত্তম উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজেদেরই উদ্যোগী হতে হবে। সবার মাঝে সবুজ আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। সবুজ আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সুপরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে জাতীয়ভাবে অধিদপ্তর কিংবা বিশেষায়িত সংস্থা গঠন করা যেতে পারে যার কাজ হবে সারা দেশে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব ও বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তোলা। দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সবুজ আন্দোলনে অর্থাত্ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী সমাজ। শিক্ষার্থীরা যেমন খুব সহজেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে পারে তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তাদের হাতে-কলমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি, কোনো কোনো দেশের মোট জনসংখ্যা এত নয়, এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীদের যদি সবুজ আন্দোলনে যুক্ত করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা যায় তাহলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী যদি একটি করেও বৃক্ষরোপণ করে তাহলে মোট ৩ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। ৩ কোটি শিক্ষার্থী যদি প্রতি বছর ২টি করে বৃক্ষরোপণ করে তাহলে এক বছরে মোট ৬ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশটা সবুজে ভরে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তলিয়ে যাবে না দেশের নিম্নাঞ্চল। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
কিন্তু সবুজ আন্দোলনের মাধ্যমে সারা দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া সহজ বিষয় নয়। সরকারি সহযোগিতা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
এক্ষেত্রে শুরুটা করা যেতে পারে বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিয়ে। দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দেড় কোটি।
এই দেড় কোটি শিশু শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একটি নির্দিষ্ট দিনে প্রত্যেকে একটি করে গাছ লাগানোর জন্য উত্সাহিত করা হবে। সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই দিনে বৃক্ষরোপণ উত্সবের আয়োজন করা যেতে পারে।
শহরের শিক্ষার্থীদের বাসার ছাদে কিংবা টবে গাছ লাগাতে উত্সাহিত করতে হবে। শিশুরা যেমন আনন্দ পাবে তেমনি তাদের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা বাড়বে।
এরপর দেশব্যাপী মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৭৫ লাখ। প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে টিম গঠন করা যেতে পারে। এই টিমগুলোর কাজ হবে নির্দিষ্ট দিনে সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা, বৃক্ষরোপণে এলাকাবাসীকে উত্সাহিত করা। নিজ নিজ এলাকায় বৃক্ষরোপণ উত্সব পালন করা। বছরের নির্দিষ্ট দিনে নিজেরা বৃক্ষরোপণ করা। মাধ্যমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থী যদি প্রতিবছর একটি করে বৃক্ষরোপণ করে তাহলে তাদের রোপিত বৃক্ষের সংখ্যা হবে বছরে ৭৫ লাখ। ফলে দেশের বনভূমির পরিমাণ বাড়বে। সবুজে ভরে উঠবে সমগ্র দেশ। কোনো দেশে বছরে ৭৫ লাখ বৃক্ষরোপণ করলে সেই দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা যেহেতু উদ্যমী ও চঞ্চল তাই এদের সহজে ‘গ্রীন মুভমেন্ট অব বাংলাদেশ’ বা সবুজ আন্দোলনে যুক্ত করা যেতে পারে ফলে একইসঙ্গে তাদের সহশিক্ষা কার্যক্রমও সম্পন্ন হবে।
তবে এই সবুজ আন্দোলন তখনই ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে যখন পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে। পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই আন্দোলন একবার ছড়িয়ে পড়লে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে এটি হবে বাংলাদেশের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
