ডিগ্রি নিয়েও আইন পেশা শুরু করতে পারছেন না

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২৩:১৬
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ ইউজিসির কাছে শিক্ষার্থীর তালিকা চেয়েছে বার কাউন্সিল তালিকা দিতে কমিশনের অস্বীকৃতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শিক্ষায় স্নাতক ও পাসকোর্স ডিগ্রিধারী অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রতিদিন ভিড় করছেন বার কাউন্সিলে। এরা বার কাউন্সিলের এডভোকেটশিপ তালিকাভুক্তি নিবন্ধন (এনরোলমেন্ট) পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে আসছেন। কিন্তু তাদের রেজিস্ট্রেশন ফরম দেয়া হচ্ছে না। যারা ফরম জমা দিয়েছেন তারাও পরীক্ষা দিতে পারছেন না। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের উপর ডিগ্রিধারী হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়েছেন চরম বিপাকে। তাদের জীবনে তৈরি হয়েছে এক চরম অনিশ্চয়তা। আইন পেশায় যোগ দেওয়ার পূর্ব শর্ত হচ্ছে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। চার বছরের স্নাতক ও দুই বছরের পাসকোর্স ডিগ্রি অর্জনের পর আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকেন। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন ফরম না দেওয়ায় এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না তারা। কবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি বার কাউন্সিল। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য শিগগিরই একটি বিজ্ঞপ্তি জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে বিগত কয়েক বছরের সেমেস্টার অনুযায়ী আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বিষয়ক তথ্য চাওয়া হবে বলে সূত্র জানিয়েছে। দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে আইন বিভাগ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যাম্পাসেও আইন বিভাগ খোলা হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে রয়েছে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে প্রায় ৬/৭ হাজার শিক্ষার্থীর এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ মনে করে, কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ। এই বাণিজ্য এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে যিনি সার্টিফিকেট নিচ্ছেন তিনি আইন বিভাগের কোর্সগুলোর নামও সঠিকভাবে বলতে পারছেন না। এই ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ ঢালাওভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদেরকে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিতে নারাজ। সেই প্রেক্ষিতে শুধু মাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের কাছে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে এনরোলমেন্ট পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফরম বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। এরপর বার কাউন্সিল একটি চিঠি দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা এলএলবি/এলএলএম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তাদের একটি তালিকা বার কাউন্সিলে পাঠাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) অনুরোধ করে। কিন্তু কমিশন এই তালিকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কমিশন বার কাউন্সিল ও দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দিয়ে বলে, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা কমিশন কর্তৃক যাচাই বাছাই সম্ভব নয়। এই চিঠি চালাচালির পর গত ১৫ মে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ বৈঠক করে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। শিগগিরই এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে জানান বার কাউন্সিলের সচিব জেলা জজ আলতাফ হোসেন। সিটি ইউনির্ভাসিটির আইন বিভাগের স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমান মিশন জানান, গত জানুয়ারিতে আমি আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছি। এরপর থেকে বার কাউন্সিলে রেজিস্ট্রেশন ফরম নিতে অনেকবার এসেছি। কিন্তু আমাকে ফরম দেওয়া হচ্ছে না। কেন ফরম দেওয়া হচ্ছে না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। একারণে আমাদের ফরম দেওয়া হচ্ছে না। তবে যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এদের জন্য অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন ভুক্তভোগী হবেন? তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন ফরম পেলেই যে তিনি আইনজীবী হবেন, তা নয়। তাকে তো এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত হতে হবে। এরপর সে নিম্ন আদালতে মামলা পরিচালনার সুযোগ পাবেন। যিনি যোগ্য তিনিই উত্তীর্ণ হবেন, অযোগ্যদের এখানে কোন স্থান নেই। অতএব সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক পাস করেন মোস্তফা আহমেদ দীপু। গ্রিন ইউনির্ভাসিটি থেকে তিনি এলএলবিতে পাসকোর্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দীপু বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা আইন শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করেছেন তারা জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে সহকারী জজ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। ব্যতিক্রম শুধু বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে। পরীক্ষা দিতে না পারায় ইউজিসিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিঠি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এলএলবি/এলএলএম প্রোগ্রামে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে এডভোকেটশিপ তালিকাভুক্তির নিবন্ধনের ব্যাপারে তাদের তালিকা কমিশন কর্তৃক সত্যয়নপূর্বক বার কাউন্সিলে প্রেরণ করার জন্য বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমিশনে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। ইউজিসির বক্তব্য এ বিষয়ে মঞ্জুরি কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা কমিশন কর্তৃক যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা, ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে এবং এসব ডকুমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত থাকে। এমতাবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের পাসকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের বার কাউন্সিলের এডভোকেটশিপ তালিকাভুক্তির নিবন্ধনের ব্যাপারে পূর্বের ন্যায় সরাসরি বার কাউন্সিলের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে বলে মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃপক্ষ মনে করে। উল্লেখ্য, যে সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কমিশন কর্তৃক এলএলবি/এলএলএম প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তার একটি তালিকা বার কাউন্সিলে ইতিমধ্যে প্রেরণ করা হয়েছে। চিঠিতে আরো বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি/এলএলএম প্রোগ্রাম কমিশন কর্তৃক অনুমোদনকালে প্রতি সেমিস্টারে ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থীর আসন নির্ধারণ করে দেয়া থাকে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২ (বর্তমানে রহিত) এর অধীনে অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রথম দিকে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আসন সংখ্যা নির্ধারণপূর্বক কমিশনকে অবহিত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। যে সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রোগ্রাম অনুমোদনকালে কমিশন কর্তৃক আসন সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি সেসকল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এলএলবি/এলএলএম প্রোগ্রামে প্রতি সেমিস্টারে সর্বোচ্চ ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করার জন্য অনুরোধ করা হলো। গত মাসে ৭৮ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষকে এই চিঠি দেয়া হয়।