সামপ্রতিক সময়ে স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে। তবুও শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এর মধ্যে ৪ থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ৩৮ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। আর প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে যারা পড়াচ্ছেন তাদের কোন প্রশিক্ষণ নেই। শিখনের অংশ হিসাবে খেলাধুলা ও আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ড সেখানে একেবারেই অনুপস্থিত। যে শিশুরা এখনও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে তাদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার এমন নানা দিক তুলে ধরে গতকাল রবিবার গণসাক্ষরতা অভিযান ‘এডুকেশন ওয়াচ প্রতিবেদন ২০১৩’ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরাই অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে প্রাক-প্রাথমিকে পড়ান। কিন্ডারগার্টেনে সব শিক্ষকই প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক উভয় স্তরে পড়ান। তবে বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রাক-প্রাথমিকে পড়ানোর জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন নন। অল্প বয়সী শিশুদের সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করতে হয় এবং তাদের কীভাবে পড়াতে হয় তা বেশিরভাগ শিক্ষকের জানা নেই। তবে ব্র্যাক ও মসজিদ ভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু প্রাক-প্রাথমিক স্তরেই পড়ান এবং তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোর ভালো দিক উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ানোর পদ্ধতির সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ানোর পদ্ধতিতে কোন তফাত্ পাওয়া যায়নি। শিখনের অংশ হিসাবে খেলাধুলা ও আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ড একেবারেই অনুপস্থিত। বই নির্ভরতা ও পড়ানোর একমুখী পদ্ধতি ছিল জনপ্রিয়। তবে ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষাক্রমের অংশ হিসাবে সব ধরনের শিশুতোষ কর্মকাণ্ডসহ শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে এক আনন্দদায়ক শিখন পরিবেশ দেখা গেছে।
প্রাক-প্রাথমিকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত নয়। বিদ্যালয়গুলোতে ভৌত সুবিধা, শিখন সামগ্রী, শিশু-বান্ধব শ্রেণিকক্ষ, আনন্দদায়ক শিখন পরিবেশ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষকের আচরণ, শ্রেণিকক্ষ কর্মকাণ্ড, বাড়ির কাজের বিধান এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়নের নিরিখে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষকে প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ থেকে পৃথক করা যায় না।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মা-বাবাদের একটি অংশ এত ছোট বয়সে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে প্রস্তুত নন। তাদের উপলব্ধি হলো- পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের পড়ালেখা দিয়ে ভারাক্রান্ত করা ঠিক নয়। তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে খেলাধুলা আর আনন্দদায়ক ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে খেলাধুলা আর আনন্দের মধ্য দিয়েই শেখার একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা, তা দেখাতে বিদ্যালয়গুলো ব্যর্থ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে শিশুদের ভর্তির হার সবচেয়ে বেশি। পিছিয়ে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হওয়া শিশুদের বয়স ৩ থেকে ১০ বছর। যদিও সরকারিভাবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির বয়স পাঁচ বছর। আর প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে শিশু ভর্তির হার সবচেয়ে বেশি কিন্ডারগার্টেনে, যা মোট শিক্ষার্থীর ২৭.৯ শতাংশ। পিছিয়ে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এখানে ভর্তির হার ২৩.১ শতাংশ আর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২১.৭ শতাংশ।
রাজধানীর এলজিইডি মিলনায়তনে ‘নব রূপকল্প পুরনো চ্যালেঞ্জসমূহ’ শিরোনামে ১৪৬ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন স্যার ফজলে হাসান আবেদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী আখতার হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শ্যামল কান্তি ঘোষ, ঢাকা আহসানিয়া মিশনের চেয়ারম্যান কাজী রফিকুল আলম, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ডেলিগেশনের ফাস্ট সেক্রেটারি লিবুসকোপোভা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেন, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের বিদ্যালয়ে আনতে হলে অনেক অর্থেরও প্রয়োজন। সরকার এদিকে চিন্তা না করলেও হবে, যদি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছে ছেড়ে দেয়। কারণ, সরকারের তত্ত্বাবধায়নে যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আছে সেখানেও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। শিক্ষক সঙ্কট, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব, বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সঙ্কট এবং ত্রুটিপূর্ণ পাঠদান। এই দিকগুলোর উন্নয়ন জরুরি।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এডুকেশন ওয়াচ ২০১৩ এর এই প্রতিবেদন ভবিষ্যতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সহায়ক হবে। এসব তথ্য-উপাত্ত নীতিনির্ধারকদের দিক-নির্দেশনায় কাজে আসবে।
কাজী রফিকুল আলম বলেন, আমাদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও ভালো করছে। আরও বিস্তৃতভাবে বেসরকারি খাতে দেয়া হলে মন্দ হবে না।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছে ছেড়ে দেয়ার সুপারিশের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিবেদনে এই বিষয়ে উল্লেখ নেই। তবে স্যার ফজলে হাসান আবেদের বক্তব্যে সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত হবে না। সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসতে হবে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান মন্তব্য করেন, আমাদের শিক্ষকদের নিয়ে সবসময়ে নেতিবাচক না বলে ইতিবাচকও বলা প্রয়োজন। এখন প্রাথমিক শিক্ষার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষকরাও অনেক পরিশ্রমী। এর বাইরেও ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে। সরকার-জনগণ ঐক্য ছাড়া সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শ্যামল কান্তি ঘোষ প্রতিবেদনে অনেক তথ্যের গরমিল আছে উল্লেখ করে বলেন, প্রাক-প্রাথমিকে শিক্ষক সঙ্কটের তথ্য হালনাগাদ নেই প্রতিবেদনে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও রয়েছে পর্যাপ্ত যা প্রতিবেদনে ওঠে আসেনি। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন ধরনের স্কুল ড্রেস, ব্যাগ এবং টিউশন ফি নেয়ার নিয়ম নেই। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এরমধ্যেও অনেক অগ্রগতি হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষায়। প্রতিবেদনে ইতিবাচক দিকও তুলে আনা উচিত।
