বাজেট ২০১৪-১৫ :দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশল প্রত্যাশিত

আপডেট : ২৬ মে ২০১৪, ২১:৩৬
প্রতিবছর বাজেট প্রণয়নের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আলাপ-আলোচনা শুরু হয়, বাজেটে কী ধরনের সুবিধাদি থাকতে হবে। প্রাক-বাজেট আলোচনা হয়, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে, সংগঠনের সাথে। অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সেরকম একটি আলোচনা সভায় আমিও বলেছিলাম কোন্ ধরনের উন্নয়ন কৌশল প্রয়োজন,বাজেটের লক্ষ্যমাত্রায় কোন্ দিকে জোর দিতে হবে, বা সেখানে কোনটা না থাকাই ভালো। আসলে বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উত্সাহটা এজন্য যে, এখানে সরকারের উন্নয়ন কৌশল এবং উন্নয়ন দর্শনের একটি প্রতিফলন ঘটে। আজকের লেখাতে জোর দিতে চাই এ দিকটাতে যে, বাজেট শুধু এক বছরের উন্নয়ন কৌশল নয়; দূরদর্শীতারও প্রয়োজন। গত কয়েক মাস ধরেই বর্তমান অর্থ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ বছর প্রবৃদ্ধি হার লক্ষ্যমাত্রার অনেকটা নিচে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও সরকারি ও অন্যান্য সংগঠনের প্রাক্কলনের মধ্যে খানিকটা ব্যবধান আছে। এ বছরের প্রবৃদ্ধি হার কম হওয়ার জন্য অনেকেই দায়ী করছে রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলাকে। এটা অবশ্যই সঠিক, কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়; সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। আর এ সত্যটি পরিষ্কার হয়; যখন গত কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধি হারের দিকে দৃষ্টিপাত করি। গত ২০১১ থেকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারের নিম্নগতি লক্ষ্য করা যায় (তথ্যসূত্র:অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা)। এই তিন-চার বছরের নিম্নগতির সাথে জড়িয়ে আছে বিনিয়োগ হারে স্থবিরতা। সুতরাং আগামীতে এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে সব ধরনের কৌশল নিতে হবে, এ বিষয়ে দ্বিমত থাকতে পারে না। বাংলাদেশ কয়েক বছরের মধ্যেই পৌঁছে যেতে চায় মধ্য-আয়ের দেশের তালিকাতে, কাজেই প্রবৃদ্ধি ত্বরায়ন জরুরি। কিন্তু একটি বিষয় বিস্মৃত হওয়াটা কাঙ্ক্ষিত নয়, এই মধ্য-আয়ের দেশের যে ধারণা, যে সীমা সেটা কিন্তু শুধু গড় আয়ভিত্তিক। সুতরাং এ লক্ষ্যে ধাবিত হতে গিয়ে এমন কৌশল নেয়াটা কিন্তু আপামর জনগণ চায় না, যে কৌশলে আয় বৈষম্য বাড়বে- সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি হবে শ্লথতর। জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে হয়তো বাড়ানো সম্ভব, যে সব খাত-উপখাতে বর্তমানে ভাল প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেগুলোকে আরো প্রণোদনা দিয়ে, সেখানে বিরাজমান উত্পাদন ক্ষমতাকে আরো পুরোমাত্রায় সদ্ব্যবহার করার মাধ্যমে, কিন্তু এভাবে অগ্রসর হলে এবং দীর্ঘ এমনকি মধ্য মেয়াদের টেকসই জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় না রাখলে শুধু যে প্রবৃদ্ধি হার দু-এক বছর পরেই আবার শ্লথ হবে তা নয়, দেশে আয় বৈষম্যও বাড়তে পারে। সুতরাং আরো নতুন খাতকে এবং দুর্বল খাতগুলোকে ভুলে গিয়ে, পাশ কাটিয়ে গিয়ে যে উন্নয়ন কৌশল সেটা সর্বাত্মক মঙ্গলের হবে না। এই প্রসঙ্গে দু-একটি বিশেষ দিকে মনোযোগ দিতে চাই; যেমন শিল্পে আরো কিছু খাত প্রণোদনা পেতে পারে। এদেশের পাট শিল্পকে আর একবার সুযোগ দেয়া যায় না? প্রতিবেশী দেশ আরো বেশি ব্যয়ে পাট উত্পাদন করছে আবার এই শিল্পে সফলও হচ্ছে। এদেশ কেন পারবে না। আর পাট শিল্প জেগে উঠলে পাট চাষিরও সুদিন ফিরবে আশা করাটা কি বেশি চাওয়া। সব শিল্প নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে প্রকাশনা শিল্প, হস্তশিল্প-খেলনা ইত্যাদি দিকে মনোযোগ দিতে হবে। গত তিন-চার বছরে প্রবৃদ্ধি কমার সাথে দুটো বিষয় জড়িত রয়েছে। প্রথম, কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, দ্বিতীয়, ক্ষুদ্র শিল্পে প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, তার আয় দাঁড়াচ্ছে এই যে শুধুমাত্র আধুনিক এবং বড় শিল্প আর আধুনিক সেবা খাতে গুরুত্ব দেবার ফলে ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ প্রবাহ কমেছে। আর কৃষি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার কারণগুলো অবশ্য সহজে অতিক্রম করার মত নয়। কৃষি জমি সীমিত, সেচের পানির প্রাপ্যতা কমছে। এ পরিস্থিতি কৃষি গবেষণায় আরো আগে থেকেই মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল। এখনো খুব দেরি হয়ে যায়নি- নতুন বীজ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, এসব বিষয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জন্য বিনিয়োগের দিকে নজর দিতে হবে। এটা তো ব্যক্তিগত হবে না, সরকারি বাজেটের এখানে বিরাট ভূমিকা। আরো একটি বিষয় বিস্মৃত না হওয়া দরকার। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী কর্মসংস্থান- আয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ,এগুলো যদি মনোযোগ না পায় বা শুধু মিছে আশা হয়ে থাকে, তাহলে মধ্য-আয়ের দেশ হওয়ার একচোখা উন্নয়ন দর্শন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। প্রতিবেশী দেশগুলো তার উদাহরণ। লেখক: বিআইডিএস-এ রিসার্চ ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত