ভুল তথ্যে প্রকল্প, ভুল বুঝিয়ে অনুমোদন!

আপডেট : ২৬ মে ২০১৯, ২২:২৮

ভুল তথ্য দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে প্রকল্প। ভুল বুঝিয়ে তা অনুমোদনও করিয়ে নেওয়া হয়। উত্স পাইপে গ্যাস না থাকা সত্ত্বেও নেটওয়ার্ক পাইপলাইন নির্মাণ করে ফেলেন কেনাকাটা; কিন্তু শুরু হয়নি সেই পাইপলাইন নির্মাণের কাজ। এতে সরকারের লোকসান ৩৫০ কোটি টাকা। এমন দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিতে। দুর্নীতিতে জড়িত পেট্রোবাংলার প্রাক্তন ও বর্তমান তিন কর্মকর্তা। তারা সুন্দরবন ছাড়াও দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতেও কর্মরত ছিলেন। জ্বালানি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার তদন্তে এ অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে আগ্রহী সরকার। এর সুযোগ নিয়ে কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ২০১০ সালে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল- খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়ায় গ্যাস বিতরণ করা।

ওই বছর শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ছয় বছর ধরে প্রকল্পটির লাইন পাইপ এবং অন্যান্য মালামাল কেনা হয়। অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ রেখেই সমাপ্ত করে দেওয়া হয়। এরপরই কেন প্রকল্পের কাজ শেষ হলো না তা অনুসন্ধান শুরু করে পেট্রোবাংলা। তদন্তে দেখা যায়, ওই ৬ বছর ধরে শুধু কেনাকাটার মধ্যেই ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। বাস্তবে কোথাও এই পাইপ লাইন তারা বসাননি।

সম্প্রতি পেট্রোবাংলার তদন্ত প্রতিবেদনে এ অনিয়মের জন্য সংস্থাটিরই তিন কর্মকর্তাকে দায়ী করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন ওই প্রকল্পের উপ-মহাব্যবস্থাপক কামাল উদ্দিন, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির সাবেক উপ-ব্যবস্থাপক কাজী আনোয়ারুল আজিম এবং সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (ক্রয়) শেখ মো. এজাজ। তারা তিনজনই পরবর্তীতে তিতাস গ্যাসে কর্মরত ছিলেন।  এদের মধ্যে কামাল সম্প্রতি মারা গেছেন এবং এজাজ চাকরি থেকে পদত্যাগ করে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। আনোয়ারুল আজিম রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানিতে (আরপিজিসিএল) উপ-মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ভুল তথ্য দিয়ে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভুল বুঝিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বিষয়টি যখন ধরা পড়ে তখন বেশ দেরি হয়ে যায়। তারপরও দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে অন্য প্রকল্প গ্রহণে কর্মকর্তারা সতর্ক থাকবেন। তিনি জানান, নেটওয়ার্ক পাইপলাইন স্থাপনের আগে উত্স পাইপলাইনে গ্যাস থাকতে হয়; কিন্তু সেই গ্যাস না থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুরু থেকে তা জেনেও গোপন করে গেছেন এবং ভুল বুঝিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আইয়ূব খান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি এই অনিয়ম অভিযোগের তদন্ত করে। সম্প্রতি তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনের আলোকে গত ১২ মে পেট্রোবাংলা একটি নির্দেশনা জারি করে। সংস্থাটির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শাহানা বেগম স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়, ‘দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের বিষয়ে আইএমই বিভাগের পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী সোর্স পাইপলাইনে ক্যাপাসিটি ছিল না। এরপরও কোনো সার্ভে বা স্টাডি না করে অবাস্তব পরিকল্পনা করে দায়িত্বহীন ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার পরিপন্থি প্রকল্পের খসড়া পরিকল্পনা (ডিপিপি) প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়, একনেক ও কমিশনকে ভুল বোঝানোর বিষয়টি তদন্ত করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পে সরকারের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির জন্য ওই তিন কর্মকর্তা দায়ী।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। আরেকজন চাকরি ছেড়ে বিদেশে রয়েছেন। অপরজন পেট্রোবাংলারই একটি কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন। বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি নিয়মিত মামলাও হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।