একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া ও আদর, ছেলেমেয়ের স্বেচ্ছাচারিতা, প্রতিটি কাজে অতিরিক্ত সহযোগিতা, খুব ছোটবেলা থেকেই কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, বাসায় একাধিকবার জোর করে পড়তে বসানো ইত্যাদি কারণে আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে স্বল্প বুদ্ধি, স্বল্প আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতার অভাব, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং অধিকমাত্রায় মা-বাবার ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে। সকল ছেলেমেয়েই যে এইভাবে বেড়ে উঠছে তা নয়। এর পুরোটাই নির্ভর করে মা-বাবা বা পরিবারের অন্যান্য অভিভাবকের আচার-আচরণের ওপর। প্রত্যেক শিশুকে তার নিজের মতো করে পরিবেশ দিতে হবে। তাকে চেষ্টা করার সুযোগ দিতে হবে, আবিষ্কার করার মতো পরিবেশ দিতে হবে, নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে, যথার্থ দিক নির্দেশনা দিতে হবে, পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে, তার সঙ্গে কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা ও কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, শিশুর মনের মধ্যে আগ্রহ জন্মাতে হবে, প্রতিটি কাজে আগ্রহী করে তুলতে হবে ইত্যাদি। শিশুর আচরণ খুব ভালো করে অবলোকন করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ছেলে আমার অনেক বড় হবে, সমাজের একজন যোগ্য মানুষ হবে। একটি দামি সার্টিফিকেট ও ভালো চাকরির প্রত্যাশায় আমরা অনেকেই আমাদের সন্তানদের ভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করাতে সচেষ্ট থাকি। কিন্তু অটিস্টিক শিশু বা অন্যান্য বিশেষ শিশুর বেলায় আমরা অনেকেই মনে করি তাদের পেছনে অর্থ ব্যয় অনর্থক। অনেক পরিবারে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়। আমাদের সমাজে অটিজম, মনোযোগে সমস্যা, চঞ্চল প্রকৃতি বা বিশেষ শিশুদের স্বাভাবিক ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য অনেক মা-বাবাই ব্যাকুল থাকেন। এতে করে আমরা যেমন অনেক টাকা নষ্ট করি, তেমনি নিজেরাও অনেক গৌরব বোধ করি। কিন্তু তাদের কী ক্ষতি করছি তা কি কখনো ভেবে দেখেছি? বিশেষ সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের স্বাভাবিক ও ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করানোর পর এরকম অনেক বাচ্চা দেখা গেছে যে, পিতামাতা ২-৩ বছর পর এসে বলছে বাচ্চার কোনো উন্নতি হচ্ছে না এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থির হয়ে গেছে ও অনেক অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যাচ্ছে। এর জন্য দায়ী কে? বাবা-মা না আমাদের সুধিসমাজ বা ডাক্তারগণ, যারা বিশেষ সমস্যাগ্রস্ত শিশুকে নরমাল বা নামকরা কোনো স্কুলে ভর্তির জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। শিশু অনুকরণের মাধ্যমে যেমন বেশি শেখে তেমনি আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই অনুকরণের জন্য শিশুর ব্রেনের কিছু ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, যা শিশুকে শিখতে সাহায্য করবে। বিশেষ শিশুদের যদি এইসব ক্ষমতা থাকতো তাহলে তারা ছোটবেলা থেকেই সাধারণ নিয়মেই অন্যান্য শিশুর মতো শিখতে পারতো। স্কুলে একজন শিশু শিখতে পারে দেখে, শুনে, নিজেকে অন্তর্ভুক্তি ও অনুভবের মাধ্যমে। কিন্তু স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে শিশুকে আগে কিছু গুণের অধিকারী হতে হবে, যেমন মনোযোগ, স্থিরতা, মনোভাব প্রকাশের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের কৌশল, নির্দেশ অনুসরণ করার দক্ষতা ইত্যাদি। যে শিশু অস্থির, মনোযোগ নেই, অনুভূতি দিয়ে বুঝতে সমস্যা, মনোভাব প্রকাশ করতে পারছে না, সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলতে পারছে না তার জন্য একটি বিশেষ চিকিত্সাভিত্তিক স্কুলের বিকল্প নেই। যেখানে বিশেষ শিশুর মনোযোগ, স্থিরতা, অনুভূতি, বুদ্ধিমত্তার কিছুটা বিকাশ ঘটিয়ে নরমাল বা ইনক্লুসিভ স্কুল ও সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আজ আপনি মেয়েশিশুদের বিয়ে না হওয়ার ভয়ে তার সমস্যা প্রকাশ করছেন না, কিন্তু এতে তার ভালো হওয়া বা স্বাভাবিক সমাজে প্রবেশ করার সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করছেন সারা জীবনের জন্য। আমাদের সমাজেরও আপনার শিশুর ওপর একটা দায়িত্ব ছিল, আপনি সমাজকে তার দায়িত্ব পালন থেকেও বিরত রাখলেন। বিশেষ একটি শিশুর জন্য বিশেষ স্কুলের বিকল্প নেই। এতে আপনার সম্মান নষ্ট হবে না বরং আত্মঅহংকারের গ্লানি থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। শিক্ষা একজন শিশুর জন্মগত নাগরিক অধিকার। এ অধিকারের ভিত্তিতে যদি আমরা একজন বিশেষ শিশুকেও একজন স্বাভাবিক শিশুর মতো চিকিত্সাভিত্তিক স্কুলের মাধ্যমে সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে পারি তাহলে সেও হতে পারে স্বাবলম্বী এবং স্বাধীনচেতা নাগরিক। আর তা না হলে সে সারা জীবন অন্যের বোঝা হয়ে থাকবে।
ঢাকা
