অংশীদারিত্বের নতুন যুগে বাংলাদেশ-জাপান

আপডেট : ২৭ মে ২০১৪, ২৩:১৫
অংশীদারিত্বে নতুন যুগের সূচনা করলো বাংলাদেশ ও জাপান। সরকারি সফরে টোকিও অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের শীর্ষ বৈঠকে দুই বন্ধু প্রতিম দেশের সম্পর্ক ও যোগাযোগ সহযোগিতার পর্যায় থেকে অংশীদারিত্বে পরিণত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সোমবার টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই নেতার শীর্ষ বৈঠকের পর গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ও টোকিও থেকে যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়। শেখ হাসিনা ও শিনজো আবে স্বাক্ষরিত এই ইশতেহারে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ বৃদ্ধিতে একসাথে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। যৌথ ইশতেহারে ঢাকা ও টোকিও আরো নিবিড় ও শক্তিশালী করতে নিয়মিত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ চীন সাগর, বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে কার্যকর ভূমিকা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ‘ব্লু ইকোনমি’র বিশেষজ্ঞ গ্রুপের বৈঠকে জাপানকে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানান শেখ হাসিনা। শিনজো আবে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অবদানের প্রশংসা করেন এবং এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার ব্যাপারে একমত হন। বাংলাদেশে একটি শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র স্থাপনে জাপান সহযোগিতা করবে। শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণে বাংলাদেশকে সহায়তা দেয়ার কথা জানান শিনজো আবে। জাতিসংঘের সংস্কারে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী একমত হন ও গুরুত্বারোপ করেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হতে জাপানকে সমর্থন দেবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি আরো ত্বরান্বিত করতে ও দারিদ্র্য হ্রাসে জাপান সহায়তা অব্যাহত রাখবে। প্রধানমন্ত্রী আবে বাংলাদেশকে এজন্য ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন (সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা) ঋণ হিসাবে প্রদানের ঘোষণা দেন। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ, যমুনা নদীর নিচ দিয়ে বহুমুখী টানেল নির্মাণ, যমুনা নদীতে পৃথক রেল সেতু নির্মাণ, ঢাকা ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণ এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী চারটি নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নে এই অর্থ ব্যয় হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকি প্রশমন খাতে জাপান সহায়তা দেবে। তৈরি পোশাক খাতে রুলস অব অরিজিন পর্যালোচনা করবে জাপান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ বিশেষ করে অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ উন্নত করার অঙ্গীকার করেন। জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য পাঁচটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় (ইপিজেড) বিশেষ স্থান বরাদ্দ থাকবে। পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে জাপান সহায়তা দেবে ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বিনিময় করবে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অনায়াসে ব্যবসা করার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটরো)’র সদর দপ্তরে আয়োজিত বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ-সুবিধা বিষয়ক এক সেমিনারে ভাষণকালে তিনি এ ঘোষণা দেন। এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড)-এ কেবল জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪০টি শিল্প প্ল¬ট বরাদ্দ রাখার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জাপানি বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই।’ এ প্রেক্ষিতে তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া আশা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, জেটরো নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতে পেরে তিনি খুবই খুশী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর ফলে দুদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। জেটরো সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বেসরকারি খাতের নেতা হিসেবে আপনারা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতির সঞ্চার করেন।’ পরে বেপজা জোনে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্ল¬ট বরাদ্দ বিষয়ে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটিজ (বেপজা) ও জেটরোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাপানের অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী মিদোরি মাতসুশিমার উপস্থিতিতে বেপজা চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হাবিবুর রহমান ও জেটরো প্রতিনিধি কে কাওয়ানো সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চমত্কার বন্ধু হিসেবে জাপান ‘আমাদের অবকাঠামোগত ও মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং বিদ্যুত্ উত্পাদন ও পরিবেশসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের সুরক্ষায় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।’ জাপানের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছে উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে এনটিটি দোকোমো, কেডিডিআই, ওয়াইকেকে, ইউএনআইকিউএলও, মিতসুবিশি, ইতোচু, মিতসুই, এসইআইওয়াইইউ ও মারুবিনি। জাপানি ব্যবসায়ীরা বিদেশে অন্যতম ব্যবসাস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী তাদের ধন্যবাদ জানান। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সম্মানে দেয়া জাপান বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল এ্যান্ড ইকোনোমিক কো—অপারেশন (জেবিসিসিইসি)’র মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। নতুন প্রজন্ম শংকামুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে পারবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম যুদ্ধ ও ধ্বংসের পরিবর্তে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও আশংকামুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে সমর্থ হবে। তিনি নতুন প্রজন্মকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন বেশি দূরে নয় যখন তারা জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট সকল চ্যালেঞ্জ ও বাধা দ্রুত দূর করবে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল জাপানের বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘শিক্ষা ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট উচিদা কাতসুইচিও বক্তব্য রাখেন। জাপানকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস ও এমডিজি’র বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাপানের অর্থনৈতিক সহায়তা আমাদের সাহায্য করেছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা গত ৫ বছরে তাঁর সরকারের কয়েকটি সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।