আট বছরেও অপূর্ণতা ও সঙ্কটের বেড়াজালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ২৭ মে ২০১৪, ২৩:১৬
আজ বুধবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী । বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ২০০৬ সালের ২৮ মে দেশের ২৬তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেখতে দেখতে দেশের মধ্য- পূর্বাঞ্চলের এ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ আট বছর অতিবাহিত করেছে। তবে এ বিদ্যাপীঠে সমস্যা আর অপূর্ণতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আট বছর পরও পূর্ণতা পায়নি এ বিশ্ববিদ্যালয়। এ অপূর্ণতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পদে পদে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। নবীন বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থ সংকট বলে এ অপূর্ণতা, প্রশাসনের এ মন্তব্য নাকচ করে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অযোগ্যতাকেই দায়ী করলেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এখানে ১৭টি বিভাগে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ করছে। পর্যাপ্ত ভূমি না থাকা, আবাসিক ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা, চিকিত্সাসেবার দুর্বলতা, অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন, লাইব্রেরির শ্রেণীকক্ষের বেহাল দশা, বিভিন্ন সময় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত করছে। অপর্যাপ্ত আবাসিক ও পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হল রয়েছে চারটি। তার মধ্যে একটি ছাত্রী হল ও তিনটি ছাত্র হল। হল অফিস সূত্রে জানা যায়, এ চার হলের স্বাভাবিক ধারণ ক্ষমতা মাত্র সাত থেকে আটশ শিক্ষার্থীর। আর এই হল সমূহে নেই কোন পড়ার কক্ষ, নেই কোন লাইব্রেরি। মাত্র দুটি জাতীয় পত্রিকা হলগুলোতে রাখা হলেও তা শিক্ষার্থীরা অনেক পড়ার সুযোগ পান না বলে জানা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা অনেক কম। উপাচার্যের জন্য রয়েছে একটি বাংলো, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে দুটি পাঁচ তলা ডরমেটরি। এ দুটি ডরমেটরিতে চল্লিশজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা থাকতে পারেন। জানা যায়, ছাত্রীদের জন্য আরও একটি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য আরও তিনটি বাংলো করার পরিকল্পনা আছে। তবে এ পরিকল্পনা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হতে পারে এমন প্রশ্নের কোন উত্তর মেলেনি। নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। দুটি পাজেরো, একটি কার, দুটি মাইক্রোবাস ও দুটি বাস। আর বিআরটিসি থেকে ভাড়ায় চালানো হয় নয়টি বাস। শ্রেণীকক্ষের সংকট ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে আছে মাত্র ৪২টি শ্রেণীকক্ষ। ১৭টি বিভাগের জন্য যা কোনক্রমেই পর্যাপ্ত নয়। কোন বিভাগের জন্য শ্রেণীকক্ষ একটি, কোন বিভাগের জন্য দুটি। শ্রেণীকক্ষের সংকট কাটাতে প্রশাসনিক ভবনের তিনটি রুমে শ্রেণীকক্ষের কার্যক্রম চালানো হয়। শ্রেণীকক্ষের সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ৩২ আসনের এক কক্ষে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি প্রশাসনিক ভবনের পাঁচতলায় একটি কক্ষে মাত্র ৩২ আসন নিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৩২ আসন। লাইব্রেরিতে ৩৬টি শেলেফ বই অপর্যাপ্ত। সব বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই পাওয়া যায় না বলে জানান শিক্ষার্থীরা। ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান তারিক ভুঁইয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, জায়গার স্বল্পতার কারণে সব বই শেলফে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। লোকবলের সংকটের কথাও জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাইব্রেরি কার্ডের আবেদনপত্র নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়নি লাইব্রেরি কার্ড। এখানে ১৭টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা রাখা হয় যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। চিকিত্সাসেবা নাজুক প্রশাসনিক ভবনে নিচতলার একটি কক্ষে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার। এ যেন এক কক্ষবিশিষ্ট হাসপাতাল। তিনজন ডাক্তারের একজন শিক্ষা ছুটিতে আছেন, কয়েকদিন পরই একজনের বিসিএস গেজেট প্রকাশের পর চাকরিতে ইস্তফা দিবেন বলে জানা যায়। বাকি একজন দিয়ে ঠেলেঠুলে চলবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের চিকিত্সাসেবার কাজ। এ মেডিক্যাল সেন্টারে আছেন একজন মেডিক্যাল এসিসট্যান্ট, একজন নার্স ও একজন এটেনডেন্ট। একটি এম্বুলেন্স থাকলেও নেই কোন স্থায়ী ড্রাইভার। এখন পর্যন্ত কোন আবাসিক ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়নি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়লে নির্ভর করতে হয় এলাকার হাতুরে ডাক্তারের উপর। ইন্টারনেটবিহীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আট বছর পরেও তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে দেশের এ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই ইন্টারনেট সংযোগ! ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা থেকে। ওয়াই-ফাইয়ের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলে কেবল দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেটের সংযোগ না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনিক ভবনে সব অফিসের জটলা প্রশাসনিক ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অফিসের অবস্থান। এখানে আছে প্রকৌশল কার্যালয়, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, মেডিক্যাল সেন্টার, বিএনসিসি’র অফিস, শিক্ষক লাউঞ্জ, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, প্রক্টর অফিস, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস, স্টোর অফিস। আছে ল্যাব, এমনকি শ্রেণীকক্ষও। অবকাঠামোগত উন্নয়ন নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্বে আবহেলার অভিযোগ পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের প্রশাসনিক কাজে সাহায্য না করে দায়িত্বে অবহেলা করেন অনেক কর্মকর্তা। কর্মচারীরাও দায়িত্বে অবহেলা করে চলছেন। বঙ্গবন্ধু হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, ঐ হলের নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্বে অবহেলা করছেন। এ হলের নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন তিনজন তারা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। হলের ঝাড়ুদারও নিয়মিত আসেন না ও দায়িত্ব পালন করেন না। এ বিষয়ে বারবার হল প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোন ফল হয়নি বলে জানান তারা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার ঘটনা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বেচ্ছাচারী মনোভাব দেখান ও শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ আচরণে করেন বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। গত ২৩ মার্চ সেকশন অফিসার মো: জাকির হোসেন এক শিক্ষকের সাথে অসদাচরণ করলে শিক্ষকরা ক্লাস বর্জনসহ মৌন মিছিলও করেন। নানা সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতাকে সঙ্গে নিয়ে আজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আট বছরে পদার্পণ করল। সীমাবদ্ধার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর্থিক অসঙ্গতি ও নবীন বিশ্ববিদ্যালয় বলে মন্তব্য করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আলী আশরাফ বলেনঃ ‘আমাদের অনেক কিছু নেই, তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে আমাদের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হচ্ছে।’ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখনও আমরা এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাইনি।’