জনপ্রশাসনে নিয়োগ-বদলি পদোন্নতির নীতিমালায় আবারও সংশোধনী আনা হচ্ছে। এতে বলা হচ্ছে- জেলা ও উপজেলায় যাদের পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকবে না- তারা জীবনের প্রথম পদোন্নতির পদ উপ-সচিব হতে পারবেন না। বলা বাহুল্য, উপ-সচিব হতে না পারলে উপরের কোন পদেই পদোন্নতির সুযোগ থাকবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্মকর্তাদের জেলা ও উপজেলায় নিয়োজিত রাখতে বাধ্য করা। বিশেষ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) পদে কর্মকর্তাদের ধরে রাখতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী এ খবর নিশ্চিত করে গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে বলেন, মাঠ প্রশাসনে বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রবণতা দীর্ঘদিন চলে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন এর রেশ টেনে ধরা দরকার। সে জন্য পদোন্নতির নীতিমালায়ও সংশোধনী আনা হচ্ছে। এখন বলা হচ্ছে- যদি কোন কর্মকর্তা পাঁচ বছর মাঠ প্রশাসনে কাজ না করেন, তবে তাকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়োগ ও বদলির নীতিমালা সংশোধন করে বলা হচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের কোন কর্মকর্তাকে নিজ (জন্মস্থান বিবেচনায়) বিভাগের মধ্যে নিয়োগ-বদলি করা যাবে না।
অপরদিকে যেসব কর্মকর্তা মাত্র এক বছর কাজ করে নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে প্রত্যাহূত বা নিজে তদবির করে ঢাকায় চলে এসেছেন তাদের আবার ইউএনও পদে নিয়োগ দেয়া হবে। বর্তমানে ২২, ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ইউএনও হিসাবে কাজ করছেন। এসব ব্যাচের অনেকেই ইউএনও হিসাবে নিয়োগ পাননি, আবার অনেকে এক বছর বা তার চেয়ে কমবেশি সময় পর প্রত্যাহূত হয়েছেন বা নিজে চলে এসেছেন।
সূত্র জানায়, যেসব কর্মকর্তা প্রত্যাহার হয়েছেন তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন মহলের চাহিদার ভিত্তিতে হয়েছে। কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা পারিবারিক কারণ বা নিজ সুবিধার কথা চিন্তা করে উপরের মহলে দেনদরবার করে ঢাকায় চলে এসেছেন। অনেক কর্মকর্তাকে সরকার বিরোধী চিহ্নিত করে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগই দেয়া হয়নি। এ ধরনের প্রবণতা ৯০ দশকের পর থেকেই চলে আসছে।
সরকারি এ পদক্ষেপের কথা জেনে প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এখন যেসব কর্মকর্তা এই ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন তাদের অনেকেরই মাঠ প্রশাসনে এক দিনের কাজ করারও অভিজ্ঞতা নেই। তাহলে তাদের কি পদাবনতি ঘটানো হবে?
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, কোথাও থেকে শুরু করতে হবে। যে কোন ভাল কাজে বাধা থাকবে; কিন্তু শুরু করা জরুরি বলেই সরকার মনে করছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য আইন প্রণয়ন করে তার দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পরিচালিত করার বিধান রাখা হয়; কিন্তু গত ৪২ বছরেও সে কাজটি হয়নি। যখন যে সরকার আসে তখন সে সরকার স্বেচ্ছাধীনভাবে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় নীতিমালা তৈরি করে এবং তা দিয়ে প্রশাসন পরিচালিত করে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সিভিল সার্ভিস আ্য্যক্ট প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। কিছু সভা-সেমিনার, বিদেশ ভ্রমণ করানো হয় কর্মকর্তাদের। একটি খসড়াও প্রণয়ন হয়। এরমধ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অবসরের বয়স বাড়ানো হয় দুই দফা। স্থায়ী পে-কমিশনও গঠন করা হয়ে গেছে; কিন্তু খসড়া আইনের বিষয়ে কোন অগ্রগতির খবর আর মিলছে না।
এখন আবার যে নীতিমালার কথা বলা হচ্ছে তা দিয়ে আবার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালানো হয় কী-না তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের আশঙ্কা- এখন ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা উপ-সচিব হওয়ার তালিকায় রয়েছেন। নতুন করে এ সিদ্ধান্ত তাদের ঘাড়ে চাপানো হলে অসংখ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হবেন। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তাদের পদোন্নতির কী হবে- সে প্রশ্নও করেছেন অনেকে।
প্রসঙ্গত, বিদ্যমান ব্যবস্থায় শুধু জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনে পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক রয়েছে। আর এখন সেটি উপ-সচিব হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্ত করা হচ্ছে।
