বর্ষার মাত্র পদধ্বনি শোনা যাইতেছে। মৌসুমের প্রাক্কালে খুব বেশি যে বৃষ্টি হইয়াছে তাহাও নহে। তথাপি আতঙ্কের বার্তা রটিয়া গিয়াছে পাহাড়ে পাহাড়ে। আর সেই আতঙ্ক যে কেবল জীবনের ঝুঁকি লইয়া পাহাড়ে বা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত হতদরিদ্র মানুষগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আতঙ্কের যৌক্তিক এবং জোরালো কারণও রহিয়াছে। পাহাড় ধসিয়া মৃত্যু নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রায় প্রতি বত্সরই মাটি চাপা পড়িয়া জীবন্ত সমাধি হইতেছে বহু পরিবারের। সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটিয়াছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন। চট্টগ্রামে সংঘটিত সেই দুর্ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় অসহায়ভাবে প্রাণ হারাইয়াছিল ১২৭ জন মানুষ। আহত হইয়াছিল অনেকেই। দুর্ভাগ্যজনক এই মৃত্যু সারা দেশকে আলোড়িত করিয়াছিল। যথারীতি প্রশাসনিক দৌড়ঝাঁপও শুরু হইয়াছিল। গঠিত হইয়াছিল উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। সেই কমিটি পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি তিন ডজন সুপারিশও পেশ করিয়াছিল। জোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হইয়াছিল সেইসব সুপারিশ বাস্তবায়নের। কিন্তু ফলাফল অভিন্ন। মৃত্যুর মিছিল থামে নাই। মাত্র এক বত্সরের ব্যবধানে ২০০৮ সালেই ঝরিয়া পড়িয়াছে আরও ২৫টি তাজা প্রাণ। ইহার পর গত অর্ধযুগে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে। দীর্ঘ হইয়াছে মৃত্যুর মিছিল। অতএব, আতঙ্কিত না হইয়া উপায় কী?
এমন কিছু মৃত্যু আছে যেইখানে কাহারও কিছুই করিবার থাকে না। সেই মৃত্যু মানিয়া লওয়া যায়। কিন্তু কিছুটা সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে যেই মৃত্যুর ভয়াবহতা অনেকাংশে এড়ানো যায়—সেই মৃত্যুর কোনো সান্ত্বনা থাকে না। প্রশ্ন হইল, বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এতোগুলি মানুষ যে অপঘাত মৃত্যুর শিকার হইতেছে—ইহার জন্য আমরা কাহাকে দায়ী করিব? যদিও প্রতিটি দুর্ঘটনার পর সকল দায় সরকারের ঘাড়েই আসিয়া পড়ে, কিন্তু ইহা যে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি, লোভ ও অসচেতনতারই অনিবার্য পরিণতি তাহা অস্বীকার করা কঠিন। ইতিপূর্বে গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়ী করিয়াছিল। তদন্তে দেখা গিয়াছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধভাবে পাহাড় কর্তন হইতে শুরু করিয়া সেইখানে বস্তি তুলিয়া ভাড়া দেওয়া অবধি সকল পর্যায়েই কোনো না কোনো সরকারি দপ্তরের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে। পুনর্বাসনের উদ্যোগ যে নেওয়া হয় নাই তাহাও নহে। তবে তাহা সফল হয় নাই। প্রধান কারণটি হইল—বেশিরভাগ বস্তিই গড়িয়া উঠিয়াছে কর্মস্থলকে কেন্দ্র করিয়া। মূলত জীবিকার তাগিদেই শ্রমজীবী হতদরিদ্র এই মানুষগুলি জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি আছে জানিয়াও অন্যত্র যাইতে রাজি হয় না। অতএব, অনভিপ্রেত এই মৃত্যুর জন্য দারিদ্র্যও কোনো অংশে কম দায়ী নহে। এই দারিদ্র্যই যে সমপ্রতি আফগানিস্তানে আড়াই সহস্রাধিক মানুষকে জীবন্ত সমাধিস্থ করিয়াছে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
দারিদ্র্যের সাথেই আমাদের বংশানুক্রমিক বসবাস। অতএব, ঢালাওভাবে দারিদ্র্যের উপর দায় চাপাইয়া নিজেদের দায়িত্বহীনতা ও অসচেতনতার দায়ভার এড়ানো যাইবে না। ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বা পাহাড়ের পাদদেশে যাহারা বসবাস করিতেছেন নিজের ও পরিবার-পরিজনের জীবনরক্ষার জন্য সর্বাগ্রে তাহাদেরই উদ্যোগী হইতে হইবে। অন্যদিকে লাগামহীন লোভের বশবর্তী হইয়া অবৈধভাবে যাহারা পাহাড়ে মৃত্যুর ব্যবসায় ফাঁদিয়া বসিয়াছেন—তাহাদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নাই। আইন লঙ্ঘনকারী যেই হউন না কেন, তাহাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনিতে হইবে। থামাইতে হইবে বেদনাদায়ক এই মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি।
