বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার বই

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ১৯:৪৯
যুগে যুগে জ্ঞানী-গুণীরা পৃথিবীতে আসেন, আমাদের জন্য রেখে যান অনেক অনেক মূল্যবান কথা। সে সব গল্প কথা আমাদের মনকে দোলা দেয়, আমাদের নতুন করে ভাবায়, স্বপ্ন দেখায়, আনন্দ দেয়। কিন্তু জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য তো আর সবাই পায় না। তাহলে তাদের মূল্যবান কথাগুলো, জানার উপায় কি!! অবশ্যই বই। লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ আছে যারা হয়ত সারাজীবনেও নিজের দেশের বাইরে যেতেই পারে না। কারণ সাধ থাকলেও সবারই সাধ্য থাকে না। অথচ তারাও নিমিষেই পেতে পারে হিমালয়ের চড়ার অভিজ্ঞতা, পেতে পারে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ভয়ংকর সৌন্দর্যের হাতছানি। একমাত্র বইয়ের মাধ্যমেই সব উত্তর পাওয়া সম্ভব। পিরামিডের দেশে, মানে বর্তমানের মিশরে, আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে রাজত্ব ছিল ফেরাউন সম্রাটদের। সেটাও জানা সম্ভব ওই বই দিয়ে। বই এলো কেমন করে এখন বই ছাড়া পৃথিবীর কথা ভাবাই যায় না। অথচ এমন একটা সময় ছিল যখন কোনো বই ছিল না। বই তো দূরের কথা তখন মানুষের কাছে কথা বলার জন্যে ঠিকমতো ভাষাও ছিল না। সে সময় পরস্পরকে কোনো কিছু জানাতো ছবি এঁকে। ছবি এঁকে এভাবে জানানোর পদ্ধতিকে বলা হয় ‘চিত্রলিপি’। ধর, কেউ একজন তার সঙ্গীকে একটা বিড়াল সম্পর্কে বলতে চাচ্ছে, তাহলে সে একটা বিড়াল এঁকে তাকে দেখিয়ে দিত। পণ্ডিতেরা বলেন, এভাবে ছবি থেকেই আসে আজকের বর্ণমালার বর্ণ বা অক্ষরগুলো। মিশরের পিরামিডে এখনও এ ধরনের চিত্রলিপি দেখতে পাওয়া যায়। আদিম মানুষের কাছে এটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ প্রাথমিক যুগে তারা পাথরের উপর খোদাই করে তাদের প্রয়োজনীয় কথা লিখে রাখত। এই ধরনের বই এখনও দেখা যায় মিশরের পিরামিডে গেলে। এই বইগুলোই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন বই। এই একই ধরনের বই একসময় ভারতীয় উপমহাদেশেও প্রচলন ছিল। খ্রিস্টের জন্মেরও আগে ভারতের রাজা ছিলেন সম্রাট অশোক। তিনিও প্রজাদের জন্য পাথরের বইয়ে অনেক কথা লিখে রেখে গেছেন। তার মধ্যে কয়েকটি কথা—‘সত্পথে থেকে পিতামাতাকে ভক্তি করবে। সব সময় সত্য কথা বলবে। অযথা পশু হত্যা করবে না। কখনও অন্যায় কাজ করবে না।’ এ রকম আরও অনেক কথা তিনি লিখে রেখে গেছেন তার পাথরের বইয়ে। সম্রাট অশোকের জন্মেরও চার হাজার বছর আগে আসিরিয়া ও ব্যাবিলন নামে দুটি দেশ ছিল। সেসময় এই দেশ দুটি খুব সভ্য ছিল। যতদূর জানা যায়, এই দুটি দেশেই প্রথমে পাথরের উপর লেখার প্রচলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের দেশে পাথর সহজলভ্য ছিল না। তাই তারা একসময় কাদা মাটির উপর লিখে তা পুড়িয়ে ইটের মতো শক্ত করত। পরে মাটি খুঁড়ে এ ধরনের অনেক পোড়া মাটির ফলক পাওয়া গেছে। মাটি খুঁড়ে ব্যাবিলনের একটি লাইব্রেরিতে এ রকম ২২ হাজারেরও বেশি পাথুরে বই পাওয়া গেছে। বইয়ের উপাদান হিসেবে পাথর, মাটির ফলক অনেকদিন ব্যবহারের পর মানুষ নতুন কিছু খুঁজছিল। কিন্তু যুত্সই কিছু তারা পাচ্ছিল না। অবশেষে মিশরের লোকেরা খুঁজে পেল নতুন কিছু, যা বইয়ের ইতিহাসে দিল নতুন এক মাত্রা। প্যাপিরাসের বইগুলো লম্বা কাপড়ের থানের মতো হতো। এই বইগুলো গুটিয়ে রাখা হতো। সবচেয়ে বড় প্যাপিরাস বইটির দৈর্ঘ্য ছিল একশ বিশ ফুট অর্থাত্ ৮০ হাত লম্বা। তাদের লেখার পদ্ধতিটাও ছিল অদ্ভুত। আজকের দিনে আমরা বাম বা ডান যেদিক থেকেই লেখা শুরু করি না কেন লাইন শেষে আবারও ফিরে আসি সেদিকে। কিন্তু মিশরীয়রা ডানদিক থেকে লেখা শুরু করে লাইন শেষ হলে পরের লাইন শুরু করতো বামদিক থেকে। আবার এই লাইন শেষ হলেই তারপরের লাইন শুরু করত ডানদিক দিক থেকে। অনেকটা কৃষকদের জমিতে হাল দেওয়ার মতো। একসময় এই প্যাপিরাস শুধু মিশরে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। আগেই বলে রাখি, এই প্যাপিরাস থেকেই কিন্তু ইংরেজি পেপার শব্দটির উত্পত্তি। মিশরিয়রা প্যাপিরাস ব্যবহার করলেও চীনারা লিখত বাঁশের ফলকে। এমনকি তারা কাপড়েও লিখত। কিন্তু সেগুলো আসলে বেশ ব্যয়বহুল ছিল। আবার ছাত্ররা তাদের হোমওয়ার্ক করতে মোমের শিট ব্যবহার করত। এরপর মোমকে গলিয়ে আবারও আগের মতো অবস্থায় নিয়ে আসতে হতো। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সবাই বিকল্প কিছু খুঁজছিল অনেকদিন থেকেই। আর এ ভাবনাটা বেশি ভাবাত তখনকার চীন সম্রাটের এক উপদেষ্টাকে। তার নাম ছিল সাইলুন। ‘বই’-এর নাম বই হলো কেন আসলে বাংলা ‘বই’ শব্দটা আরবি শব্দ ‘ওহি’ থেকে এসেছে। আরবিতে ওহি শব্দের অনেকগুলো মানের একটি হলো প্রত্যাদেশ বা স্রষ্টার পাঠানো বাণী। সে হিসেবে পবিত্র কোরান শরীফ হলো প্রত্যাদেশের সংকলন। বাংলাদেশে ওহি শব্দটা প্রথমে মানুষের মুখে মুখে ‘বোহি’ আর সেখান থেকে আস্তে আস্তে বাংলায় ‘বই’ হিসেবে রূপ নেয়। ‘Book’ শব্দটা এসেছে প্রাচীন ইংরেজি শব্দ boc থেকে। আর এ প্রাচীন শব্দটা এসেছে জার্মানি শব্দ bok থেকে। বক বলতে আসলে তারা বিচ গাছকে বোঝাত। তাই অনেকে বলেন, ‘বিচ’ (beech) শব্দ থেকে ইংরেজি বুক (Book)শব্দের উত্পত্তি। ইউরোপের একটি গাছ আছে, যার নাম বিচ। প্রাচীনকালে মানুষ এই বিচ গাছের কাঠের উপর লেখার কাজ করত। তাই অনেক পণ্ডিত বলেন, বিচের উপর লিখতে লিখতেই ‘বক’, তারপর এই বক থেকেই ‘বুক’ শব্দের উত্পত্তি হয়েছে। মজার মজার গল্প, উপন্যাস, কমিকসের কাহিনী, কবিতার কথা, ছড়ার কথা বা এ ধরনের লেখাগুলো লেখকরা সাধারণত তাদের কল্পনা থেকে বানিয়ে লেখেন। এসব কাহিনী সত্য বা কল্পনাপ্রসূত দুটোই হতে পারে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো পাঠককে আনন্দ দেওয়া। এই বইগুলোই আসলে ফিকশন। তবে, বই যতভাবেই পরিবর্তিত বা বিবর্তিত হোক না কেন, বইয়ের আবেদন ফুরাবে না কোনোদিন। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই বইয়ের মতো এমন ভালো বন্ধু পাওয়া খুঁজে পাবে না কখনও। কারণ বই পড়া ভারি মজার একটা কাজ, যে বই পড়েছে সেই এ কথাটা জানে। তাই বই পড়ুন বেশি বেশি।