নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ কবি, সাংবাদিক ও নাট্যকার সাযযাদ কাদির কয়েক যুগ ধরে লিখে আসছেন। তিনি কাব্যে ও গদ্যে হূদয়নিঙরানো গভীর অনুভূতি দিয়ে চিত্রায়িত করেন মনের না বলা কথা ও জীবনের অজানা, বাস্তব কাহিনী। তাঁর কাব্যভাষা সহজ ও সাবলীল, কিন্তু ভাব ও চিন্তায় অতল গাম্ভীর্যে ভরা। তাঁর চিন্তা সাহিত্যের, চেতনা অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ, নীতি-নৈতিকতায় দৃঢ়চেতা। তাঁর পাণ্ডিত্য অহংকার করার মতো এবং দুর্বলের সিঁড়ি। দ্যুতিমান এই মানুষটির শৈশব-কৈশোর নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। লিখেছেন সৈয়দ শিশির
শৈশব-কৈশোরে সাযযাদ কাদিরের দিনগুলো কেটেছে খুবই আনন্দে। টাঙ্গাইল শহরের আকুরটাকুর পাড়ায় ১৯৪৭ সালের ১৪ এপ্রিল তাঁর জন্ম। পিতৃপ্রদত্ত নাম শাহ নূর মোহাম্মদ, আর ডাকনাম বাবর। বাবার নাম এস এম আব্দুস সালাম এবং মায়ের নাম মাহমুদা বেগম। গৃহশিক্ষকের সহযোগিতায় কবি বাড়িতেই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ১৯৫৫ সালে শহরের বিন্দুবাসিনী উচ্চ বিদ্যালয়ে সরাসরি চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুবই মেধাবী। নবম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় সব পরীক্ষায়ই তিনি প্রথম স্থান দখল করতেন। সাহিত্যের প্রেমে জড়িয়ে পরবর্তীতে অবশ্য ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বাড়ি থেকে তাঁর বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় দেড় মাইল। যাতায়াতব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া-আসা করতে হতো। বর্ষাকালে খুবই অসুবিধা হতো চলাচলে। পথিমধ্যে বৃষ্টির কবলে পড়লে বই আর জামা বাঁচাতে মানকচু কিংবা কলাগাছের পাতাই ছিল ভরসা।
বাড়ির পাশেই ছিল লৌহজং নদী। সুযোগ পেলেই সে নদীতে সাঁতার কাটতেন কবি। এ ছাড়া বাড়ির চারপাশে ছিল বিশাল দিঘি। এসব দিঘি ভরা থাকত নানা প্রজাতির মাছে। নদীতেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু কবির শৈশবের সেই নদীটি আজ মরে গেছে। যা কবিকে খুবই দুঃখ দেয়। চলার পথে সাপ, কুকুর কিংবা গরু দেখে খুবই ভয় পেতেন, কখনও চিত্কার করে ওঠতেন। এ নিয়ে বন্ধুমহলে কত হাসাহাসি। শৈশবে গোল্লাছুট ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। পরবর্তীতে ব্যাডমিন্টন, ফুটবল আর ক্রিকেট খেলেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। বাবার প্রেরণায় কবিও নিজেকে একজন দক্ষ ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করেছিলেন। পাড়ার টিমে তিনি ফরওয়ার্ডে খেলতেন। দল ও দর্শক বরাবরই তাঁর কাছে গোল প্রত্যাশা করত। তিনি তাদের নিরাশ করতেন না। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ছিলেন তাঁর দলের অধিনায়ক। দল জেতার আনন্দে যিনি একবার সাযযাদ কাদিরকে কাঁধে নিয়ে প্রায় চার মাইল হেঁটেছিলেন। বাবা সালাম সাহেব ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাঁর আরও ৯ ভাই-বোন ছিল, যারা প্রত্যেকেই অকালপ্রয়াত। একমাত্র সন্তান হওয়ার কারণে পুত্র সালামকে সবাই অত্যধিক আদর-স্নেহ করতেন। আর অকালপ্রয়াত সন্তানদের (কবির চাচা ও ফুফু) বইগুলো পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কবি। বাড়িতে নিয়মিত ৪-৫টা পত্রিকা রাখা হতো। বিশেষ করে বাড়ির মেয়েদের জন্য ‘বেগম’ আর ছেলেদের জন্য শিশু পত্রিকা ‘আলাপনী’ ও কলকাতা থেকে প্রকশিত ‘শুকতারা’ রাখা হতো। এমন পরিবেশে তাই শৈশবেই কবির পড়ার নেশা তৈরি হয়েছিল। চতুর্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই শুরু হয় তাঁর কবিতা চর্চা। বিদ্যালয়ের দেওয়াল পত্রিকা ‘বাতায়ন’-এ তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি সম্পাদনা করতেন আজকের বিশিষ্ট কবি আল মুজাহিদী। এলাকায় বছরে একবার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো। এতে পালাগান, যাত্রাপালা আর নাটকের ব্যবস্থা থাকত। ১৯৬২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো যাত্রাপালা ‘রূপবান’ দেখেছিলেন। পরবর্তীতে যাত্রাপালা নিয়ে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম উপন্যাস লিখেন। সেটির নাম ‘অপর বেলায়’। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রূপবানের পালার একটি গানের কথা থেকেই উপন্যাসটির নামকরণ করা হয়েছে।’ তরুণবেলায় কবি পাড়ায় নাটকের আয়োজন করতেন। এসব নাটকে তিনি প্রম্পটার ছিলেন। একসময় নাটক লিখতে ইচ্ছে হলো। সত্তর ও আশির দশকে মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনের জন্য নিয়মিত নাটক লিখেছেন। কয়েকটি নাটকে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৭৬ সালে টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত জেলা নাট্যোত্সবে ‘পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা’ নাটকটি পরিচালনার জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। নাটকটি বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমেদের লেখা।
কবির শৈশবে বাড়ির আশপাশে মক্তব খুঁজে পাওয়া ছিল মুশকিল। যে কারণে বাড়িতে মৌলভী সাহেবের তত্ত্বাবধানে আমপারা, ছিপারা ও কোরআন পড়া শিখেছেন। তাঁর দাদা সুপরিচিত ছিলেন ‘দেলদুয়ারের পীর’ হিসেবে, যিনি টাঙ্গাইলের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে হেড মৌলভী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দাদা আদর করে কাছে টেনে আদব শেখাতেন। সাযযাদ কাদিরের শৈশব কাটানো শহরে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল বেশি। কিন্তু সম্প্রীতির কোনো ঘাটতি ছিল না। হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিশে চলতেন। যেকোনো উত্সবে সবাই আনন্দ করতেন। ঈদে নতুন সিনেমা দেখার নেশা ছিল কবি কাদিরের। সংগ্রহ করতেন পত্রিকার ঈদ ও বিশেষ সংখ্যাগুলো। হাজারো বই পাঠের পর ১৯৬২ সালে তিনি পাঠ করলেন সমর সেনের কবিতার বই ‘গ্রহণ’। যা কবিকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, নতুন কিছু লিখতে শেখায়, নতুন পথে হাঁটতে শেখায়। বিন্দুবাসিনী উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে কবি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ এমএ পাস করেন। অধ্যয়নরত অবস্থায় মাসিক কণ্ঠস্বর ও মাসিক বিচিত্রায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সাপ্তাহিক সংকেত, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক আগামী, পাক্ষিক তাঁরকালোক, কিশোর তাঁরকালোক, দৈনিক দিনকালসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫-২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অধ্যাপনাও করেছেন। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, ফিল্ম ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোর্স টিচার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৬ সাল থেকে রেডিও-টিভির বহু অনুষ্ঠানে তিনি রচনা, পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘তাত্ক্ষণিক’ (বিটিভি, ১৯৮২), ‘প্রত্যয়’ (১৯৮৭), ‘শাণিত সংকল্প’ (১৯৯২-৯৫), ঈদের ‘আনন্দমেলা’ ও বিশেষ নাটক। গণচীনের রেডিও পেইচিংয়ে ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ডেস্কটপ পাবলিকেশনের তিনি অন্যতম পথিকৃত্। ১৯৬৯ সালে ঢাকায় গণঅভ্যুত্থানের তিনি অন্যতম রূপকার ও সংগঠক। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। যে কারণে তাকে নৃশংসভাবে নির্যাতিত হতে হয়েছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, উপন্যাস, শিশুতোষ, সঙ্কলন, স্মৃতিকথা ও সম্পাদনাসহ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৭০টি। আন্তর্জাতিক সাহিত্যের সব শাখায় গবেষণা করে বাঙালি পাঠকদের তিনি অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা কবিতাকে তিনি আলোকিত করেছেন মেধা ও শব্দশিল্পের জোরে। তাঁর কবিতায় প্রজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট। শিশু-কিশোরদের রাজ্যেও তিনি নন্দিত। তাঁর ভাষা জাদুকরী, চমকপ্রদ ও কাব্যিক। সমাজ জীবন সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি, তীক্ষ পর্যবেক্ষণ, তথ্যসমূহ উপস্থাপনায় রয়েছে তাঁর নিজস্ব মুন্সিয়ানা।
একুশে স্মৃতি স্বর্ণপদক, কবি জসীম উদদ্ীন পুরস্কার, নন্দিনী পুরস্কার, শৈবভারতী পুরস্কারসহ লাভসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। তরুণদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ হলো—অধ্যয়ন, অনুশীলন আর অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
