নাচ, গান, কবিতা, অভিনয়ে তিনি যেমন সকলকে মুগ্ধ করেন, তেমনি পড়ালেখাতেও তাকে হার মানায় এমন সাধ্য কার! দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদ থেকে ডিনস অ্যাওয়ার্ডও পেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সফল এক অধ্যায় শেষ করেছেন সবেমাত্র। তার উদ্যোগেই সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকা বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক আইন সংসদে পাস হয়েছে। প্রতিভাময়ী ও পরিশ্রমী এই মেয়েটির নাম বিপাশা মতিন। তাকে নিয়ে লিখছেন আহসান রনি
অসম্ভব দুষ্টু ছিলেন ছোটবেলায়, পড়ালেখায়ও ছিলেন অসম্ভব কাঁচা। অঙ্ক বিষয়টা খুব কঠিন লাগত তার। ০ থেকে ৪ পেয়ে অতঃপর বিশেষ বিবেচনায় পাস করে করে প্রমোশন। তবে একদিন ঘটল অসাধারণ এক ঘটনা। অঙ্কে ১৮ পেলেন তিনি। তিনি খুব খুশি! তার জীবনে অঙ্কে পাওয়া সর্বোচ্চ নম্বর। কিন্তু তার আনন্দকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে স্কুলের একজন শিক্ষিকা তাকে খুব অপমান করে বলেছিলেন, ‘তোমার বাবা একজন প্রফেসর আর তোমার পড়ালেখার এই হাল কেন? কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।’ সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যেভাবেই হোক অঙ্ককে হারাবেন। তাই-ই হয়েছিল পরে। আর কখনো ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু অঙ্ক নয়। সব বিষয় ভালোভাবে পড়ে তিনি চান্স পেয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে। ছোটবেলায় পড়াশোনা না করলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। নাচ, গান, কবিতা, অভিনয়—সবকিছুই শিখেছেন শিল্পকলা একাডেমি থেকে। এছাড়াও বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নৃত্যকলার উপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন। বিতর্ক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল, মার্কেটিং বিভাগ ও সর্বোপরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ হয়ে। জড়িত ছিলেন বিভিন্ন বিতর্ক ক্লাবের সাথেও। মার্কেটিং ডিবেটিং ক্লাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টও ছিলেন। বিজয় দিবস এটিএন বাংলা বিতর্কে তিনি ছিলেন জয়ী দলের অন্যতম সদস্য। বর্তমানে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাউথ জোনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন এই তরুণী। খুব ছোটবেলা থেকেই এক্সট্রাকারিকুলার কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকার ফলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো প্রোগ্রাম থাকতো। কখনো বই নিয়েই যেতেন, ফাঁকে ফাঁকে পড়ার জন্য। তবে এত কিছুর পাশাপাশি পড়াশোনার ক্ষেত্রে ফ্যামিলিই তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাবার কথা ছিল একটাই—যাই করো, রেজাল্টটা খুব ভালো হওয়া চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা ছিল এসব কাজের অনুপ্রেরণা। ক্লাস মিস করলেও স্যার কী পড়িয়েছেন তা ঠিকই খবর পেয়ে যেতেন। ফলে তার রেজাল্টও ছিল অনেক ভালো। ৩.৯৮ রেজাল্ট করে ডিনস অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন তিনি। দুই দিকই সফলভাবেই সামলেছেন একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে। তা হলো, যখন যে কাজটি করেছেন, খুব মনোযোগ দিয়ে করেছেন। কাজের গুরুত্ব বুঝে কাজ করেছেন।২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক আইন ২০১৩ সংসদে পাস হয়। খুব অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল বিপাশার। সংসদে বসে নিজের চোখের সামনে সেই আইনটি পাস হতে দেখেন তিনি। নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রত্যাশায় ‘বিল্ড বেটার বাংলাদেশ’-এর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন তিনি। তবে নতুনদের হাতে দিয়ে খুব শীঘ্রই নিজের নতুন একটি যুব উন্নয়ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন তিনি। এই সংগঠনের কাজ হবে দেশের উন্নয়নে তরুণদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্বে তৈরি ও তাদের ক্ষমতায়ন করা। তরুণ হিসেবে তিনি মনে করেন, নিজের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে আর তার সাথে একটু সাহস যোগ করে নিলে ভালো যেকোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব। অন্যের কাজের সমালোচনা না করে নিজের দায়িত্ব পালন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে স্বার্থপরের মতো একেবারে নিজের জন্য ভাবলে চলবে না। কাজ করতে হবে দেশের জন্য। প্রত্যয় নিতে হবে একটি সুন্দর দেশ গড়ার।
