রাতে চলাচলকারী মানুষের মাঝে ছিনতাইয়ের ভয় সবসময় থাকে। কিন্তু যারা প্রয়োজনে বা দুর্ঘটনায় বাসার বাইরে বের হন তাদের এক সীমাহীন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। রাতবিরেতে বের হলে দ্রুত চলাচলের জন্য কোন বাহন পাওয়া রাজধানীতে একটা খুব বড় সমস্যা। যারা ভুক্তভোগী তারাই বোঝেন বিষয়টা। প্রয়োজনে বাইরে বের হয়ে দ্রুত যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিকশা পাওয়াটা যেন হাতে লটারির টিকিট পাওয়ার মতই দামি। পাড়ার মোড়ে না পাওয়া গেলেও বড় রাস্তায় বেরিয়ে এলে রিকশা পাওয়া যায়। কিন্তু গন্তব্য দূরে হলে রিকশায় যাওয়া সম্ভব হয় না। আর এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় রাতের বেলা অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীর ক্ষেত্রে।
সাধারণত রাজধানীর ক্লিনিকগুলোতে জরুরি বিভাগ থাকে না। এসময় অসুস্থ মানুষদের নিয়ে জেনারেল হাসপাতালেই ছুটতে হয়। আর রাতের বেলা নির্ভরযোগ্য চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালই মানুষের প্রধান ভরসা। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ কোন রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোই যেন একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয় ভুক্তভোগীদের সামনে।
গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে শ্যামপুর বালুর মাঠ এলাকা থেকে অসুস্থ জামাল উদ্দিনকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ঢুকলো একটি রিকশা ভ্যান। রাত তখন সোয়া তিনটা। অনবরত বমি করছেন তিনি। দ্রুত তাকে নিয়ে যাওয়া হলো জরুরি বিভাগে। এসময় তার সঙ্গে আসা পরিবারের সদস্য এনামুল হক বললেন, রাত দেড়টার দিক থেকে বমি শুরু করেছেন তিনি। মাথা ঘুরছে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। এত রাতে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেল না, কোন সিএনজি পাইনি পথে। কোন যানবাহন পাচ্ছি না, মনে হচ্ছিল রোগী রাস্তাতেই মারা যাবে। শেষে পাড়ার এক ভ্যানচালককে অনুরোধ করে নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, এই পথটুকু আসতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। রোগীর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে মরেই যাবে। কিন্তু কি বা করার ছিল আমাদের।
গত কয়েকদিন ধরে রাতে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে জামাল উদ্দিনের মত বাহনের সমস্যার কথা জানালেন অনেকেই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল, সিকদার মেডিক্যাল প্রভৃতি হাসপাতালে আসা রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা সবাই একই অভিযোগ করেন।
এদিকে, বাংলাদেশে বেড়াতে আসা কলকাতার নাগরিক অরিজিত্ ব্যানার্জি বললেন, কলকাতায় প্রতিটি পাড়ায় ট্যাক্সিস্ট্যান্ড রয়েছে। রাতে তাদের জানিয়ে দিতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ওই স্ট্যান্ডে তালিকাভুক্ত ট্যাক্সি বাসায় চলে আসে। এজন্য নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে বেশি টাকা দিতে হয় ঠিক কিন্তু নিরাপত্তা ও প্রয়োজনে এটা খুবই উপকারি। কিন্তু ঢাকার নাগরিকরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
অরিজিত্ ব্যানার্জির মত ঢাকার বাসিন্দারাও এই রকম ব্যবস্থা করার দাবি জানালেন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, মহল্লাভিত্তিক যে স্ট্যান্ডগুলো আছে, এগুলোকে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এনে একটি কাঠামো দাঁড় করানো প্রয়োজন। যাতে এলাকার মানুষ সেইসব স্ট্যান্ড কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে রাতের বেলা প্রয়োজনে সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি বা ভাড়ায় চালিত গাড়ি পেতে পারে। এতে নাগরিকদের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি বিপদে আপদে মানুষের প্রয়োজন মিটবে।
দিনের বেলা রাস্তার মোড়ের স্ট্যান্ডগুলোতে সিএনজি অটোরিকশা সহজেই মেলে। বেশি ভাড়া গুনতে হয় ঠিক কিন্তু প্রয়োজনের সময় বেশি ভাড়া দেয়াটাও বাধা নয়। কিন্তু রাতের বেলা বেশি ভাড়া দিয়েই পাওয়া সম্ভব নয় কোন বাহন। ট্যাক্সিক্যাব প্রায় উঠেই গেছে। দ্রুত যাতায়াতের জন্য রয়েছে সিএনজি অটোরিকশা। কিন্তু রাতের বেলা সেটাই বা মিলছে কোথায়। রোগীদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে যাওয়াটাই ভাল। কিন্তু সেসবের ভাড়া সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে নয়। তাছাড়া হাসপাতালে বা ক্লিনিকে যোগাযোগ করে অ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করাটাও সময়সাপেক্ষ। বরং রোগীর চিকিত্সার জন্য তখন দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোটাই জরুরি। রাজধানীর রাতের বেলা মানুষের এই সমস্যাটার সমাধান করবে কে?
