বর্ধিত ঋণ সুবিধার আওতায় ১৪ কোটি ৯ লাখ ডলার ছাড় করার ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ওয়াশিংটনস্থ সদর দফতরের নির্বাহী বোর্ড গতকাল এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। বাংলাদেশের লেনদেনের ভারসাম্যে স্থিতিশীল রাখতে মোট সাত ধাপে এ ঋণ দিচ্ছে সংস্থাটি।
তিন বছর মেয়াদি বর্ধিত ঋণ সুবিধার চুক্তিটি করা হয়েছিলো ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল। প্রায় ৯৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ (৬৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার এসডিআর) এ বর্ধিত ঋণ সুবিধার অর্থ বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে ছাড় করছে সংস্থাটি। এর আগে চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড় করা হয়েছে গত নভেম্বরে।
এবারের কিস্তির টাকা ছাড়ের আগে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নতুন মূল্য সংযোজন কর আইন বাস্তবায়ন শুরু, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামো পুনর্গঠন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়, ভর্তুকি কমানো ইত্যাদি। প্রতি কিস্তি অর্থ ছাড়ের আগে বাংলাদেশে আইএমএফ এর প্রতিনিধিদল এসে শর্তগুলো কতটুকু প্রতিপালন করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। সর্বশেষ গত মার্চে প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে গতকাল সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ইসিএফ এর আওতায় সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন দিক শক্তিশালী পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু গত জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। এর পরেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে ছিলো। সেইসাথে কাঠামোগত কিছু পরিবর্তনও হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় আয়ের অনুপাতে সরকারি খরচের নিম্নগতিও লক্ষ্য করা গেছে।
আইএমএফ মনে করে নির্বাচন পরবর্তী সময়কালে দেশের সামষ্টিক চাহিদা বাড়বে এবং আগামী ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর নাগাদ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হবে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আবার ফিরে আসলে তা প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেতে পারে, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার এবং প্রসাশনিক ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বগামী করতে পারে। চলতি অর্থবছরে চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত (আমদানি ও রফতানি ব্যবধান) জিডিপি’র ১ দশমিক ৩ শতাংশে থাকবে, যার ফলে পরবর্তী অর্থবছরে ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আর্থিক নীতিতে বিচক্ষণতা থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
পর্যালোচনায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি বিনিয়োগ ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে জিডিপি’র অনুপাতে সরকারি ঋণ পর্যায়ক্রমে নামিয়ে আনতে হবে। সরকারি বাজেটে বিচক্ষণতা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত অনেক কম। এটি বাড়াতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করতে হবে, সেইসাথে কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। আর্থিক খাতের বিভিন্ন সংস্কারের দিক উল্লেখ করে আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে। আর্থিক খাত শক্তিশালী করতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর তদারকি বৃদ্ধি, এ সংক্রান্ত সুশাসনের উন্নতি, স্বয়ংক্রিয় আর্থিক প্রতিবেদন পদ্ধতি এবং পুনঃঅর্থায়নের বিষয়ে নজর দিতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্ম পরিবেশের উন্নতিসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় আরো সুনির্দিষ্টকরণের আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। এসকল কার্যক্রমের মাধ্যমে টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করে সংস্থাটি।
