কালজয়ীদের আত্মজীবনীমূলক বই পাঠাগারে চাই

আপডেট : ৩১ মে ২০১৪, ১৯:৩৪
যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠার সুবাদে জীবনে অনেক সুধীজনের সাথেই আমার পরিচয় হয়েছে। না। তাদের সাথে আমার কখন দেখা হয়নি। কারণ সেই সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে বাবা-চাচাদের মুখে থেকে শুনে তাদের অনেকের সাথেই ভালোভাবে পরিচিত হয়ে গেছি। তেমনি একজন কালপুরুষের নাম ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া’। এদেশের স্বাধীনতায় লেখনীর মাধ্যমে যার বিশেষ অবদান রয়েছে তিনি হলেন ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ছোটবেলা থেকে এই অবধি শুনে আসছি তাঁর নাম। কালজয়ী পত্রিকা ইত্তেফাক হলো জীবনের প্রতিবিম্ব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে হুবহু যেমন দেখা যায়, মানিক মিয়ার ইত্তেফাক পত্রিকাও ছিল ঠিক তেমনি। সত্যিকার অর্থে আমার মতো অনেক তরুণই একবাক্য স্বীকার করবে যে, এদেশের অন্যান্য পত্রিকার চাইতে ইত্তেফাক এখনও তার পূর্ব ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখেছে । ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় মানিক মিয়া বের করেন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। তিনি নিজেই এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পরেই অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন কায়েদে আযম জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগের ব্যাপক ভরাডুবি হয়। মুসলিম লীগের এই ভরাডুবির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ও সেখানে মানিক মিয়ার ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে লেখা ক্ষুরধার লেখনী। সেই ‘ইত্তেফাক’ কালে কালে বাঙালির মুক্তির মুখপত্রে পরিণত হয় একসময়। মানিক মিয়া সাংবাদিকতাকে কখনোই পেশা হিসেবে নেননি। তিনি একে নিয়েছিলেন জনগণের ‘খেদমতের’ অংশ হিসেবে। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘আমি আমার চিন্তাশক্তি ও কর্মদক্ষতা সর্বতোভাবে ইত্তেফাকের পিছনেই নিয়োজিত করিয়াছিলাম। সংবাদপত্রের মারফত দেশবাসীর যতটুকু খেদমত করা যায় তাহাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। এই দিক দিয়া আমি ‘ইত্তেফাক’কে শুধুমাত্র জীবিকা ও অর্থোপার্জনের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করি নাই। যে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে ‘ইত্তেফাক’ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, সেই জনগণের অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করাই ছিল আমার ব্রত। কোনো প্রলোভন বা স্বার্থচিন্তা দ্বারা আমি কখনও প্ররোচিত হই নাই।’ কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকচক্র ইত্তেফাকের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে কখনই মেনে নিতে পারেনি। তারা বারবার আঘাত এনেছে এই পত্রিকাটি ও তার সম্পাদকের উপর। তবু তিনি নিষ্ঠার সাথে এই পত্রিকার সম্পদনা চালিয়ে গিয়েছেন। মোসাফিরের কলাম যদিও আজ আমরা পাই না তবুও প্রবীণদের মুখে তার লেখনীর গল্প শুনে বিস্মিত হই। এরকম আরও অনেক তথ্য হয়তো আমাদের অজানা, সেই অজানা তথ্য আমরা জানতে চাই। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ আরও যারা কালজয়ী পুরুষ ছিলেন তাদের সকলের জীবনী গ্রন্থ দেশের সকল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে দেওয়া উচিত। তাতে করে আমাদের মতো আগ্রহী অনেক তরুণ-তরুণী বিশিষ্ট জনদের সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পারতাম। লেখক : অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ (মানবিক), কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, রংপুর।