তুমি আবার আসবে কী?

আপডেট : ৩১ মে ২০১৪, ১৯:৩৬
‘অসির চেয়ে মসি বড়’ প্রবাদটি ছাত্রজীবনে ঠাহর করতে কষ্ট হতো, আসলে কথাটি দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে। এখনও যারা স্কুল কিংবা কলেজের গণ্ডী পেরোতে পারেননি তাদেরও ঠাহর না করতে পারারই কথা। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও প্রবন্ধ সম্পর্কে একটু লেখাপড়া করলেই ধরা পড়ে সত্যি মসি কী ও কেন? আর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জীবনী পড়লে আমাদের কাছে ধরা পড়ে সাংবাদিকতা, দেশপ্রেম, জনগণের মুক্তি, গণতান্ত্রিক চেতনা কী ও কেন? দক্ষিণ বঙ্গের সন্তান মানিক মিয়া ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি, জীবিত থাকাকালীনই মানিক মিয়া ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে হয়ে গেলেন একটি প্রতিষ্ঠান। আজকের দিনেও মানিক মিয়া বাঙালির প্রেরণা। ১৯৩৫ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করে তিনি পিরোজপুর মহাকুমা সিভিল কোর্টে অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা ও আত্মসম্মানবোধে বলিয়ান মানিক মিয়া সে চাকরি বেশিদিন করতে পারেননি। জনৈক মুন্সেফ সাহেবের খারাপ আচরণের প্রতিবাদে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন, যে সময় সরকারি চাকরি ছিল সোনার হরিণের চেয়ে বড় কিছু। তখন সামান্য খারাপ আচরণকে তিনি নিজের উপর অপমানবোধ মনে করে চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। কিন্তু মানিক মিয়ার সেই আদর্শকে কি আমরা মূল্যায়ন করতে পেরেছি? এখনকার কোনো সরকারি চাকরিজীবীর কি এমন কোনো আত্মসম্মানবোধ কাজ করে? সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি আর যে সরকারি চাকরি করেননি তা নয়, তিনি যোগদান করেছিলেন বরিশাল জেলার জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু সেখানেও তিনি নিজেকে স্থিতি করতে পারেননি। যার থাকে একটি সার্বজনীন মন ও হূদয়, তার পক্ষে কি কোনো চৌকুঠিতে বাঁধাধরা জীবন যাপন করা সাজে? তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ডাকে সাড়া দিয়ে সে চাকরিতেও ইস্তফা দিলেন এবং কলকাতায় পাড়ি জমালেন। সেখানে তিনি কলকাতা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন এবং সরাসরি রাজনৈতিক কর্মতত্পরতার মধ্যে জীবন উত্সর্গ করেন। এবং রাজনীতিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিমণ্ডলে আটকে রাখা উচিত নয়, এই চিন্তা-চেতনার ধারক হিসেবে রাজনৈতিক প্রচারণাকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে একটি প্রচারপত্রের প্রয়োজন অনুভব করেন। তার উদ্যোগেই আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকা এবং তিনি ১৯৪৭ সালের আগস্টে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এর পরিচালনা পর্ষদের সেক্রেটারি হিসেবে যোগদান করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি পত্রিকাটি ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা করেন কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফলে সেটা করতে ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। তা ছাড়া ১৯৪৭ সালে তিনি সোহরাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাকেও কাজ করেছিলেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৯ সালের দিকে মানিক মিয়া ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি আওয়ামী মুসলীম লীগের মুখপত্র হিসেবে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে’ যোগদান করেন। তখন সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের আনুষ্ঠানিক সম্পাদক ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী এবং প্রকাশক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান। পিরোজপুরের মানিক মিয়া হয়ে উঠলেন সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ মানিক মিয়া এবং ১৯৫১ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে মানিক মিয়ার পত্রিকা বেশ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় এবং ধীরে ধীরে সম্পাদনার জগতে একটু জ্যেষ্ঠতা এলেই মানিক মিয়া ১৯৫৩ সালে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’কে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ পরিণত করেন। মানিক মিয়ার নিরলস শ্রম এবং একনিষ্ঠতায় দৈনিক ইত্তেফাক হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের মুখপত্র নয়, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মুখপত্র। দৈনিক ইত্তেফাক শুধু আওয়ামী-লীগের জয়গান গেয়েই ক্ষ্যান্ত ছিল না, হয়ে উঠেছিল জনগণের পত্রিকা। জনগণকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা এবং জনগণের সুখ-দুঃখের কথা উঠে আসতে লাগল দৈনিক ইত্তেফাকের পাতায়। মানিক মিয়া হয়ে উঠলেন ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৪ সালের ‘যুক্তফ্রন্ট’ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল মানিক মিয়া ইত্তেফাকের জোরে। মানিক মিয়া শুধু পত্রিকা সম্পাদনার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না। শুরু করলেন মসির মাধ্যমে রাজনৈতিক ঘোলাটে পরিবেশকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার কাজ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ ও প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হলেন মানিক মিয়া এবং তার দৈনিক ইত্তেফাক। সামরিক সরকার দিন গুণতে লাগলেন এবং ফন্দি আঁটলেন কীভাবে তাকে শায়েস্তা করা যায় এবং ১৯৫৯ সালে সামরিক আইন ভঙ্গের দায়ে মানিক মিয়াকে এক বছর জেলে আটকে রাখা হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সামরিক জান্তার ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেননি, অসম সাহসে মানিক মিয়া দ্বিগুণ উত্সাহে শুরু করলেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কলাম ধরা এবং পুনরায় ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্ররোচনার দায়ে তাকে আটক করা হলো। শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আন্দোলন আলোর মুখ দেখত না, যদি না ইত্তেফাক ও মানিক মিয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে খড়গ হস্ত না হতেন। ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন মানিক মিয়া আবারও আটক হন সামরিক শাসকের নির্দেশে। এমন অগণিতবার মানিক মিয়া আটক হয়েছেন জনগণের মুক্তির আন্দোলনের জন্য। মানিক মিয়ার অনেক সৃষ্টি আছে, তার থেকে কি আমরা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছি? আজও নেতারা জেল খাটেন, তবে সেটা জনগণের মুক্তির জন্য, নাকি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য? সেটা পরিষ্কার নয়। মানিক মিয়ার থেকে অনেক শেখার আছে জাতির, ব্যক্তি মানিক মিয়ার ১৯৬৯ সালে মৃত্যু হলেও আজও তিনি প্রাসঙ্গিক এখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। দৈনিক ইত্তেফাক নিয়েই শুধু মানিক মিয়া দিন পার করেননি। আরও দুটি পত্রিকা তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে ‘ঢাকা টাইমস’ ও ‘পূর্বাণী’ পত্রিকা দুটিও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় সামরিক শাসক কর্তৃক। মানিক মিয়া সম্পাদক হিসেবে নয়, মূলত কলাম লেখক হিসেবে সচেতন জনগোষ্ঠীর মন কেড়েছিলেন। তিনি ‘রাজনৈতিক হালচাল’ ও ‘মঞ্চের নেপথ্যে’ এবং ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে কলাম লিখে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি এই কলামগুলো মোসাফির ছদ্মনামে লিখতেন। এবং এই কলাপ লেখনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত সৃষ্টি করেন। মানিক মিয়া শুধু সম্পাদকই ছিলেন না, তিনি একাধারে ছিলেন রাজনীতিক ও দার্শনিক। কিন্তু তার সেই দর্শন আজ কোথায়? তা আজ ভূলুণ্ঠিত, তার এখনকার জ্ঞাতি ভাইরাও তার দেখানো পথে চলে না। মনে হয় সবাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার হীন চেষ্টায় বিকারগ্রস্ত। আজও বর্তমান বাংলাদেশে (মানিক মিয়ার যার জন্য আন্দোলন শুরু করে গিয়েছিলেন, যা আজও শেষ নামেনি) বহু সংবাদপত্র ও সম্পাদক আছেন কিন্তু তাদের মধ্যে কি একজন মানিক মিয়া সৃষ্টি হতে পারেনি! যে জাতি গুণীজনের সম্মান দেখাতে পারে না, সে জাতি গুণীজনের শুভাগমন আশা করতে পারে না। আমাদের মাঝে আবারও একজন মানিক মিয়ার বড় প্রয়োজন, তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার ফরিয়াদ, হে বিধাতা! পরম করুণাময় আমরা আজ বড় পথভ্রষ্ট, আমাদের পত্রিকাগুলো আজ হলুদ সাংবাদিকতায় রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে, জাতি আজ বড় অসহায়, আমাদের মাঝে আর একজন মানিক মিয়াকে পাঠাও, বাংলার অপার জনগোষ্ঠী একটু হলেও স্বস্তি পাক। লেখক : আইনজীবী