পূর্ব লন্ডনে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীর কাছে লেবার প্রার্থীর নির্বাচন পরাজয়ের কারণ কি?

আপডেট : ৩১ মে ২০১৪, ২২:০৫
বিগত ২২ মে পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারা ব্রিটেনের নির্বাচনের ইতিহাসে একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এই বারার কাউন্সিল নির্বাচনে (স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকার) মেইন স্ট্রিম রাজনীতির দু’টি প্রধান দল লেবার ও টোরি পার্টি এবং আরও কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে একযোগে পরাজিত করে জামায়াত ও অন্যান্য মৌলবাদী গ্রুপগুলো দ্বারা সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী লুতফুর রহমান মেয়র হিসেবে জয় লাভ করেছেন। অবশ্য এটা তার প্রেডিকটেবল ভিকটোরি। টাওয়ার হ্যামলেটস বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা এবং এই এলাকায় শুধু বাংলাদেশের জামায়াত নয়, অন্যান্য এথনিক কম্যুনিটির (যেমন সোমালিয়ান মুসলমান) মৌলবাদী গ্রুপগুলোর সম্মিলিত সমর্থন লুতফুর রহমান পেয়েছেন। ২০১০ সালে যখন প্রত্যক্ষ ভোটে বারার মেয়র নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়, তখন লেবার পার্টির মনোনীত বাংলাদেশি প্রার্থীকে পরাজিত করে বাংলাদেশি লুতফুর রহমান প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। তখনও তার পেছনে প্রচ্ছন্ন জামায়াতী সমর্থন ছিল কিন্তু এতো প্রকট ছিল না। লুতফুর রহমানও লেবার পার্টির লোক ছিলেন। মেয়র পদে লেবার পার্টির মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বহুদিন থেকেই এলাকার বাংলাদেশি ও অন্যান্য এথনিক কমিউনিটির প্রতি লেবার পার্টির একটা উপেক্ষার মনোভাব থাকায় এই কমিউনিটিগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির মনে একটা অসন্তোষের ভাব ছিল। বিরাট সংখ্যক বাংলাদেশি এই বারায় বসবাস করার ফলে এই বারা লন্ডনের ‘বেঙ্গলি ডিস্ট্রিক্ট’ নামেও পরিচিত। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে এই এলাকার আফ্রো-এশিয়ান ক্যারিবিয়ান বাসিন্দারা ছিল লেবার পার্টির সুরক্ষিত ভোট ব্যাংক। এই কেন্দ্র থেকে অন্য কোনো দলের বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়লাভের সম্ভাবনা ছিল কম। একবার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে একজন বাংলাদেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে জয় লাভ করেছিলেন। তিনিও লেবার পার্টির সদস্য ছিলেন; তবে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন এবং ব্যাপারটাও ছিল সাময়িক। ২০১০ সালের বারা কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লুতফুর রহমানের জয়লাভ তেমন গুরুত্ব পায়নি। তিনিও লেবার পার্টির লোক ছিলেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জয় লাভের পর তিনি আবার লেবার পার্টিতে ফিরে যাবেন এবং লেবার পার্টিও তাকে গ্রহণ করবে এটাই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তা ঘটেনি। এলাকার বাংলাদেশিরা তখন লেবার পার্টির প্রতি উপেক্ষিত ও অবহেলিত হিসেবে ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে মিথ্যা অজুহাতে আমেরিকার বুশ সরকারের ইরাক আক্রমণে ব্রিটেনের লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সহযোগিতা ব্রিটেনের শুধু বাংলাদেশি মুসলমানদের নয়; অন্যান্য এথনিক কমিউনিটির মুসলমানদেরও লেবার পার্টির প্রতি বিক্ষুব্ধ করে তোলে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় তখনকার অধিকাংশ পশ্চিমা সরকারের ইসলাম ফোবিয়া এবং ‘ইসলামি জঙ্গি’ দমনের নামে সাধারণ মুসলমানদেরও হয়রানি করার নীতি। এই নীতিরই সুযোগ গ্রহণ করে ব্রিটেনেও বিভিন্ন উগ্র মুসলিম মৌলবাদী গ্রুপ— বিশেষ করে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী। এতোকাল তারা “বিলাতে ইসলাম ধর্ম প্রচারের” মুখোশের আড়ালে তাদের রাজনৈতিক তত্পরতা চালাচ্ছিল। তা তেমন হালে পানি পায়নি। আফগান ও ইরাক যুদ্ধ এবং পাকিস্তানেও ড্রোন হামলা চালিয়ে নিত্য অসংখ্য মুসলমান নর-নারী হত্যার পর ব্রিটেনেও বাংলাদেশের জামায়াতের ‘একটিভিস্টরা’ অন্যান্য মৌলবাদী সংগঠনসহ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং “পশ্চিমা খ্রিস্টান আগ্রাসন থেকে নির্যাতীত ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষার” নামে বিলাতে বসবাসকারী মুসলমানদের (বাংলাদেশিসহ) মধ্যে বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বারাতেও তার প্রতিফলন ঘটে। ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনেই মৌলবাদীরা নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটায় এবং লুতফুর রহমান মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে কেন্দ্র করে আরও শক্তিশালী হয়। ইরাক যুদ্ধের ঘোর বিরোধী কয়েকজন প্রভাবশালী বাম ব্রিটিশ নেতা-যেসন কেন লিভিংস্টোন, জর্জ গ্যালোয়ে প্রমুখও এই উগ্র মৌলবাদীদের “সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মুসলিম শক্তি” ভেবে টাওয়ার হ্যামলেটস-এ এদের সমর্থন দিতে এগিয়ে আসেন এবং পূর্ব লন্ডনের একটি কেন্দ্র থেকে লেবার পার্টির ত্রিশ বছরের একাধিপত্য ধ্বংস করে এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীকে পার্লামেন্ট সদস্যপদের নির্বাচনে পরাজিত করে মৌলবাদীদের সহায়তায় বামপন্থি জর্জ গ্যালোয়ে নির্বাচিত হন। টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় মৌলবাদী- তথা জামায়াতীদের খুঁটি আরো শক্ত হয়। পূর্ব লন্ডন বা “বেঙ্গলি ডিস্ট্রিক্টে” বাংলাদেশি মুসলমান, সোমালিয়ান মুসলমান এবং অন্যান্য এথনিক কমিউনিটির মুসলমানেরা বিরাট জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যে মৌলবাদীদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলার ব্যাপারে ব্রিটিশ এস্টাবলিসমেন্টেরও (লেবার এবং টোরি) অবদান আছে। আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে পূর্ব লণ্ডন বা ইস্ট এণ্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে। ব্রিটেনের মেইন স্ট্রিম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে গিয়ে তারা স্বাভাবিকভাবেই সোস্যাল ডেমোক্রেসির মতবাদের দিকে ঝোঁকে এবং লেবার পার্টির অনুসারী হয়। এরা শক্তিশালী এন্টি রেসিস্ট মুভমেন্টও গড়ে তুলেছিল। তারা মৌলবাদ-বিরোধীও ছিল। রক্ষণশীল ব্রিটিশ এস্টাবলিসমেন্ট এদের ভয় পেতে শুরু করে। এই অশ্বেতাঙ্গ তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক চেতনা ব্রিটিশ হোয়াইট এস্টাবলিসমেন্টের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এই আশঙ্কা থেকে তারা পূর্ব লণ্ডনের উদীয়মান তরুণ বাংলাদেশি নেতৃত্বকে ধ্বংস এবং কমিউনিটির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করে। ইস্ট লণ্ডন মসজিদ ভিত্তিক মৌলবাদী ও জামায়াতী গোষ্ঠীগুলোকে তারাই তোল্লা দিতে শুরু করেন। কয়েকটি শক্তিশালী ব্রিটিশ মিডিয়া কয়েকজন উদীয়মান বাংলাদেশি তরুণ নেতার চরিত্র হনন শুরু করে। রাজনউদ্দীন জালাল, কুমার মুরশিদ এবং এরকম আরো কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণ নেতা আশির দশকে বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে কমিউনিটি-রাজনীতি এবং মূল ব্রিটিশ রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবেন মনে করা হয়েছিল। ব্রিটিশ এস্টাবলিসমেন্টের একাংশ এবং একশ্রেণীর ব্রিটিশ মিডিয়ার চক্রান্তে তারা তা পারেননি। বিভেদ নীতি ও প্রোপাগাণ্ডার শিকার হয়েছে এই নেতৃত্ব, যারা চিন্তা চেতনায় ছিল সেক্যুলারিস্ট এবং মৌলবাদ-বিরোধী। তাদের বিপর্যয়ে পূর্ব লণ্ডনে সেক্যুলারিস্ট ও গণতান্ত্রিক শিবিরে ভাঙন ধরে। তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংস্থাগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে। মসজিদ-কেন্দ্রিক মৌলবাদী গ্রুপগুলোর শক্তি বাড়ে। টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে লুতফুর রহমানের প্রথম দফা ও দ্বিতীয় দফা বিজয় তারই ফল। তবু এই পরিস্থিতিতেও একটা আশার বিদ্যুত্ চমক ছিল। ব্রিটেনের গত সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব লণ্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত প্রধান নির্বাচন কেন্দ্র থেকে পার্লামেন্টে লেবার পার্টি রোশনা আলী নামে এক শিক্ষিত বাংলাদেশি তরুণীকে সদস্য হিসেবে জিতিয়ে এনে ওই আসনটি পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়। রোশনা আলীর জয়ের প্রধান কারণ ছিল, তিনি বিলাতে অধিকাংশ বাংলাদেশির জন্মস্থান সিলেট থেকে এসেছেন, নিজে প্রগতিশীল শিবিরের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন এবং পূর্ব লণ্ডনের সেক্যুলারিস্ট এবং গণতান্ত্রিক শিবির, বিশেষ করে আওয়ামী লীগপন্থিরা তার সমর্থনে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে রোশনা আলীর মধ্যে ভেসিলেসন নীতি দেখা যায় এবং অনেকে মনে করেন, তিনি তার নির্বাচন কেন্দ্রে মৌলবাদীদের দিকে জনমতের হাওয়া ঘুরছে দেখে তিনিও পার্লামেন্টে তার আসনটি রক্ষার জন্য মৌলবাদী শিবিরের প্রতি এপীজমেন্ট পলিসি গ্রহণ করেছেন। তার এই দোদুল্যমানতা লুতফুর শিবিরের শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং ব্রিটেনের আগামী সাধারণ নির্বাচনে এই কেন্দ্রে লুতফুর ও জামায়াত সমর্থিত কোনো প্রার্থী যদি রোশনা আলীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় এবারের মেয়র নির্বাচনে লুতফুর রহমানকে জয়ী করার জন্য জামায়াত ও মৌলবাদীরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল এবং তাদের কৌশলী প্রোপাগাণ্ডা ভোটারদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। লুতফুর রহমান শুধু নিজে জেতেননি, তার গ্রুপের আরও ১৮ জনকে কাউন্সিলার পদে জিতিয়ে এনেছেন। এই সাফল্য অর্জনের জন্য প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল বহু আগে থেকে। লণ্ডনে একটি মেয়র পদের নির্বাচন ছিল ২২ মে। ব্রিটেনের কোনো নির্বাচনেই কোনো হৈ চৈ হয় না। কিন্তু এবার টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় মেয়র নির্বাচনে হৈ চৈ হয়েছে বাংলাদেশি কায়দায়। নির্বাচনী ডামাডোল ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিশাল ডামাডোলের মতো। বারার বাংলাভাষার পত্রিকাগুলোয় লুতফুর রহমানের ছবি ও প্রচারণা প্রতি সপ্তাহে এমন বিশালভাবে চলেছে যে, মনে হয়েছে তিনি একটি বারায় মেয়র পদে নয়, একেবারে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অনেকে বলেছেন, নির্বাচনে ভোটদানও হয়েছে ব্রিটিশ কায়দায় নয়, হয়েছে বাংলাদেশি কায়দায়। অনেকে অভিযোগ করেছেন, এই নির্বাচনে বাতাসে টাকা উড়েছে। অধিকাংশ বাংলা মিডিয়া, এমনকি কিছু কিছু প্রগতিশীল ছাপ মারা বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কি কারণে হন্যে হয়ে তাকে সমর্থন দিয়েছে, তাও এক রহস্য ঢাকা ব্যাপার। কেউ মুখ খুলে কিছু বলতে চায় না। এছাড়া বিবিসি’র প্যানোরমা অনুষ্ঠানটিও লুতফুর রহমানকে নির্বাচনে সাহায্য করেছে। নির্বাচনের আগে হঠাত্ তারা সিটিং মেয়র হিসেবে লুতফুর রহমানের ফাইনান্সিয়াল ডিলিংয়ে ত্রুটি রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন। এ সম্পর্কে পুলিশী তদন্তের ব্যবস্থা হয়। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে প্যানোরমার অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটা লুতফুর রহমানের জনসমর্থন আরো বাড়িয়ে দেয়। পূর্ব লন্ডনের কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেছেন, এই ব্যাপারে পুলিশ আসল জায়গাটিতে হাত দিতে পারেনি এবং সেটা তাদের এখতিয়ারের মধ্যেও ছিল না। লুতফুর রহমান মেয়র হিসেবে কোনো অর্থনৈতিক অনিয়ম করেননি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কাউন্সিলের গ্রান্ট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিতরণে কমিউনিটির মৌলবাদী সংগঠনগুলোকে আনুকূল্য দেখিয়েছেন, সেক্যুলার ও প্রগতিশীল সংস্থাগুলোকে কৌশলে এই আনুকূল্যদান থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। ফলে মৌলবাদী সংগঠনগুলোর শক্তি বেড়েছে এবং এই শক্তি তার রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। লুতফুর রহমানের সমর্থকেরা এই অভিযোগের প্রতিবাদ জানান। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এই অভিযোগের পক্ষে দাঁড়ায়। টাওয়ার হ্যামলেটস বারার ভোটদাতারা লুতফুর রহমানকে দ্বিতীয়বারের জন্য মেয়র নির্বাচিত করার ব্যাপারে তাকে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ভোটদাতাদের এই সমর্থন অর্জনের জন্য তিনি একসঙ্গে তিনটি কার্ড খেলেছেন। প্রথমটি সিলেটি কার্ড (বারার বাংলাদেশি ভোটদাতারা অধিকাংশ সিলেট থেকে এসেছেন), দ্বিতীয়টি বাংলাদেশি এবং এন্টি হোয়াইট কার্ড (তিনি হোয়াইট এসটাবলিসমেন্টের বিরুদ্ধে নিজেকে বাংলাদেশিদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার একমাত্র প্রতিভূ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন)। তৃতীয়টি ইসলামী কার্ড। সউদি আরব থেকে পবিত্র কাবা শরিফের খতিবকে লন্ডনে আনা হয়েছিল তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। তাতে লন্ডনের মুসলিম কম্যুনিটির মধ্যে লুতফুর রহমানের মর্যাদা ও সমর্থন দারুণভাবে বেড়েছে। তদুপরি বারার একশ’ আলেম ও মসজিদের ইমাম (অধিকাংশ জামায়াত-সমর্থক বলে জানা যায়) তার সমর্থনে প্রোপাগান্ডায় যোগ দেয় এবং সংবাদপত্রে যুক্তবিবৃতি দিয়ে তাকে সমর্থন জানাতে থাকে। এই মসজিদভিত্তিক প্রোপাগান্ডায় স্রোতের বিরুদ্ধে লুত্ফুর বিরোধী অন্য প্রার্থীরা দাঁড়াতে পারেননি। পূর্ব লন্ডনে এখন রাজনৈতিক বিভাজনটি স্পষ্ট। একদিকে এথনিক কম্যুনিটিগুলোর সেক্যুলার ও প্রগতিশীল শিবির অনৈক্য জর্জরিত; বহুধা বিভক্ত এবং দুর্বল। অন্যদিকে জামায়াত ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সঙ্ঘবদ্ধ, বিপুলভাবে শক্তিশালী। এখন বারার মেয়র ও মিডিয়া তাদের হাতে। তাদের মসজিদভিত্তিক রাজনীতি আরও শক্তি বাড়ানোর সুযোগ পাবে। কাউন্সিলের ক্ষমতা ও অর্থেই হয়তো এই রাজনীতির পালে আরও হাওয়া লাগবে। অনেক সচেতন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আশঙ্কা করেন, ইউরোপের মধ্যে ব্রিটেনেই প্রথম একটি ছোট্ট তালেবান দ্বীপ মাথা তুলতে পারে। সময় থাকতে সাবধানতা প্রয়োজন। লেখাটি শেষ করে এনেছি, এমন সময় খবর পেলাম, ব্রিটেনের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ মেয়র লুতফুর রহমানের উপর রুষ্ট হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে আবার তদন্তের হুমকি দিয়েছেন। উপ-প্রধানমন্ত্রীর জানা উচিত, ব্যক্তি বিশেষের প্রতি হুমকি দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। টাওয়ার হ্যামলেটস বারার সমস্যাটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধির। এই ব্যাধি দূর করার উদ্দেশ্যে বারার সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ না করলে একজন লুতফুরকে ঠেকিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। লন্ডন ৩১ মে শনিবার, ২০১৪]