প্রজন্ম আইকন

আমাদের ই-শিক্ষক

আপডেট : ০১ জুন ২০১৪, ২০:০৪
যুক্তরাষ্ট্রের বার্মিংহামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালাবামার (ইউএবি) সহকারী অধ্যাপক, ইউএবি সিক্রেট ল্যাবের পরিচালক, বাংলা উইকিপিডিয়ার ব্যুরোক্র্যাট, শিক্ষক ডটকম ও বাংলা ব্রেইল প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ড. রাগিব হাসান। এসব পরিচয়ের বাইরে আমাদের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ই-শিক্ষক হিসেবে। সফল ও মেধাবী এই প্রজন্মের মানুষটির বেড়ে ওঠা ও সাফল্যের গল্পগুলোই উঠে এসেছে আমাদের এই আয়োজনে প্রতিবারেই যখন নিজের শহর চট্টগ্রামে যেতেন, তখন বাসার গেটটা দেখলে তার মনে হতো, ‘এবার মনে হয় বাসায় এসেছি।’ কিন্তু এবার বাংলাদেশে এসে যখন এয়ারপোর্টে বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড দেখলেন, তখন তার মনে হয়েছিল—বাড়ি এসেছেন, মায়ের কাছে ফিরে এসেছেন। এবারে দেশে ফেরার অভিজ্ঞতা এমনই মধুর ছিল রাগিব হাসানের। রাগিব হাসানের বাড়ি জামালপুরে হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বাবা মো. শামসুল হুদা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মা রেবেকা সুলতানার দুই সন্তানের মধ্যে রাগিব একজন। তার স্ত্রী চিকিত্সক জারিয়া আফরিন চৌধুরী। তাদের একমাত্র সন্তান যায়ান। ইন্টারনেটের বিশাল ভাণ্ডারে বাংলাদেশ প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বিদেশিরা তো বটেই, আমরা বাংলাদেশিরাও দেশসংক্রান্ত কোনো তথ্য খুঁজতে গেলে পেত সামান্যই। সেই দৈন্য ঘোচাতে ড. রাগিব হাসান ২০০৪ সালে উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশবিষয়ক নিবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ইংরেজি সংস্করণ দিয়েই শুরু করেছিলেন। হয়েছিলেন উইকিপিডিয়ার প্রশাসক। তবু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। বাংলাদেশে বহু মানুষের কাছে ইংরেজি দুর্বোধ্য। তাই উইকিপিডিয়ার এত বড় তথ্যভাণ্ডার অনেকের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছিল। অথচ উইকিপিডিয়া হচ্ছে গণমানুষের জন্য। নিখরচায় এত ভালো বিশ্বকোষ আর একটিও নেই। তার ওপর এটি হালনাগাদ হচ্ছে নিয়মিত। তাই তিনি ২০০৬ সালে বাংলায় অন্তর্ভুক্তি দেওয়া শুরু করেন। অবশ্য বাংলা উইকিপিডিয়ার পত্তন ঘটে ২০০৪ সালের শেষ ভাগে। প্রথম দিকে নিবন্ধ ছিল নামমাত্র। প্রয়োজন ছিল উত্সাহী একদল স্বেচ্ছাসেবীর। ছবি ও লেখা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাগিব হাসান বিভিন্নভাবে প্রচার শুরু করেন। সাড়াও পেলেন। বাড়তে লাগল উত্সাহীর সংখ্যা। বর্তমানে বাংলা উইকিতে নিবন্ধের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে এ কাজে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানা সমস্যাও। লেখকরা বেশির ভাগই বিশেষজ্ঞ নন। উন্মুক্ত লেখালেখির সুযোগ নিয়ে কেউ ভুল তথ্য দিতে পারেন। মুছেও ফেলতে পারেন। যেমন—২০০৫ সালের জুন-জুলাই মাসে দেখা গেল, একদল লোক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাতাগুলোতে মিথ্যাচার শুরু করেছে। রীতিমতো গবেষণায় তথ্য-প্রমাণ বের করে তাদের ঠেকিয়েছিলেন রাগিব হাসান। রাগিবের পথ চলার শুরুটা এমনই। রাগিব হাসানের উদ্যোগে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মাত্রই জানেন, উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় বাংলা ভাষায় বইপত্রের বেশ অভাব, কিছু ক্ষেত্রে প্রায়ই তা ইংরেজি বইয়ের হুবহু অনুবাদ। খটমটে অনুবাদের এসব বই শিক্ষার্থীর জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর বদলে অনেক সময়ই বিজ্ঞানকে করে তোলো আরও ভীতিকর। আবার ইন্টারনেটে প্রকাশিত বিজ্ঞানের নানা তথ্য ও জার্নাল অধিকাংশই বিদেশি ভাষায়। বিভিন্ন কঠিন অভিধা এবং জটিল তথ্য-উপাত্তে সেসব প্রায়শই শিক্ষার্থী-গবেষকদের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে। অনেক ক্ষেত্রে নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করতে আগ্রহীদের ক্রেডিট কার্ডে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। শিক্ষার এই বিপত্তি এড়াতে রাগিব হাসানের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে এগিয়ে এসেছেন একঝাঁক পেশাদার শিক্ষক ও গবেষক। তারা শিক্ষক ডটকম নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেটে চালু করেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নানা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। আলোর এই স্কুলে এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে পুরোপুরি বিনামূল্যে এবং বাংলা ভাষায়। এতে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে। একই সঙ্গে বাড়ছে অমর একুশের গৌরবমাখা বাংলা ভাষার প্রসারও। শিক্ষক ডটকম বাংলা ভাষায় মুক্ত জ্ঞানের প্রকাশ ও বিকাশের জন্য এমনই একটি অভিনব ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্তমঞ্চ। এ ধরনের উদ্যোগ বাংলা ভাষায় এটিই প্রথম। ওয়েবসাইটটি চালু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও বিভিন্ন ব্লগ সাইটে এ নিয়ে বেশ সাড়া লক্ষ করা যায়। শিক্ষক ডটকমের পথচলা শুরু হয় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। রাগিব হাসানের মাথায় ব্যতিক্রমী এই ধারণাটি আসে ২০১১ সালে ক্লাসে পড়ানোর সময়। ভাবনাটা ছিল বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস যদি ভিডিওতে ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে অনেক শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন। এরই ধারাবাহিকতায় চালু হয় শিক্ষক ডটকম। বর্তমানে সাইটটিতে চালু আছে বিজ্ঞান, বাণিজ্য, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদির ওপর বিভিন্ন ভিডিও পাঠ। কোর্সগুলো কাজে আসবে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের। সিলেবাসের বাইরের বিষয়ের কোর্সও অন্তর্ভুক্ত আছে সাইটটিতে। কোনো শিক্ষার্থী চাইলে নতুন কোনো বিষয়ের ভিডিও কোর্স চালুর অনুরোধও রাখতে পারবেন। কোনো শিক্ষক পাঠদান করতে আগ্রহী হলে যুক্ত হতে পারেন ভার্চুয়াল পাঠশালার সাথে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের পড়াশোনা এমনিতেই জটিল। তার ওপর বইপত্রসব বিদেশি ভাষায় লেখা বলে কম্পিউটার বিজ্ঞানের নবীন শিক্ষার্থীরা নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়। গোড়া শক্ত না হওয়ায় ভবিষ্যতে অধিকতর জটিল সমস্যা সমাধানে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পায় না—এসব ভেবে রাগিব হাসান তৈরি করেছেন বাংলায় কম্পিউটার বিজ্ঞান শেখানোর সাইট যন্ত্রগণক ডটকম। সাইটের মূল পাতায় লেখা আছে, ‘বাংলা কম্পিউটিংয়ের জগতে স্বাগতম’। যা শুরু হয়েছে বেসিক কিছু কোর্স দিয়ে। গল্পের ছলে শেখানোর চেষ্টা চলছে অ্যালগরিদমের (গাণিতিক পরিভাষা) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেওয়া হয়েছে লেকচারের ভিডিও। বাসায় বসে সময় করে একদিন শুরু করে দিলেই হলো। এরপর ধাপে ধাপে শেখা যাবে ক্লাউড কম্পিউটিং, প্রোগ্রামিং কিংবা সিকিউরিটির বিভিন্ন কলাকৌশল। ভাষা আর দেশ—এই দুই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই প্রযুক্তি-দুনিয়ায় বাতিঘর হয়ে কাজ করছেন রাগিব হাসান। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় চতুর্থ এবং উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতকে প্রথম স্থান অধিকার করায় পেয়েছেন বুয়েটের চ্যান্সেলর পুরস্কার এবং সিএসই বিভাগের স্বর্ণপদক। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে পিএইচডি করার সময় কাজ করেছেন গুগলে। আর ২০১২ সালের আগস্টে অনলাইনে বাংলা ভাষার প্রথম স্কুল গড়ে তোলেন রাগিব হাসান। নাম দেন শিক্ষক ডটকম (www.shikkhok.com)। এর আগে তিনি কম্পিউটার বিজ্ঞান শেখানোর জন্য আরেকটি ওয়েবসাইট যন্ত্রগণক ডটকম প্রতিষ্ঠা করেন। তবে কেবল প্রযুক্তি নয়, বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিষয়ে অনলাইনে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে কোর্সভিত্তিক শিক্ষাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষক ডটকম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় এমন উদ্যোগের জন্য ইতোমধ্যেই গুগলের ‘রাইজ’ ও আইএসআইএফ অ্যাওয়ার্ড, দ্য ববস ইউজার অ্যাওয়ার্ড ও ইন্টারনেট সোসাইটি কমিউনিটি গ্র্যান্ট—সবই বাংলায় অনলাইন-ভিত্তিক প্লাটফর্ম শিক ডটকমের ঝুলিতে। ‘শিক্ষকতা আমার পেশা ও নেশা’, বললেন রাগিব। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা পড়িয়েছেন, তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। যাতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও ই-শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করা যায়। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষাকেও ছড়িয়ে দিতে চান বাংলাদেশের সর্বত্র।