বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষাখাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গত শুক্রবার ইত্তেফাক কার্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘শিক্ষক ডটকম :একটি ভার্চুয়াল আলোকবর্তিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং দৈনিক ইত্তেফাক। মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম খানের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন দৈনিক ইত্তেফাকের পরিচালক তারিন হোসেন। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক মোজাহেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এসএম আশফাক হোসেইন, বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর, সিটিও ফোরামের সভাপতি তপন কান্তি সরকার ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদুল বারী, ওরাকলের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ মোতাহারুল ইসলাম সুমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফায়সাল হোসেন প্রমুখ। বৈঠকে মুখ্য বিষয় ছিল শিক্ষক ডটকমের (www.shikkhok.com) প্রতিষ্ঠাতা এবং বার্মিংহামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালাবামার কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন। প্রজন্মের এই মেধাবীজনকে নিয়ে আমাদের এবারের বিশেষ আয়োজন। সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও গ্রন্থনা করেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও আহসান রনি
‘শিক্ষক ডটকম :একটি ভার্চুয়াল আলোকবর্তিকা’ শীর্ষক গোলটেবিলে আয়োজনে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষক ডটকমের (www.shikkhok.com) প্রতিষ্ঠাতা এবং বার্মিংহামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালাবামার কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান। এ প্রজন্মের জন্য তা তুলে ধরা হলো—
শুরুতেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এ ধরনের একটা আয়োজনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। দৈনিক ইত্তেফাক ও আইসিটি মন্ত্রণালয়কেও ধন্যবাদ উদ্যোগ নেওয়ায়। আজকের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষক ডটকম সম্পর্কে আপনাদেরকে কিছু জানানো। অনলাইনে এটা আসলে শেখা ও শেখানোর দারুণ একটা সুযোগ। আমি নিজেও পড়াই বিদেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু একটা সময় মনে হলো, এতে আসলে আমার নিজের দেশের শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হচ্ছে? অনলাইনে ইংরেজিতে এ রকম কয়েকটি ওয়েবসাইট থাকলেও বাংলাতে ছিল না। সেই চিন্তা থেকেই মূলত শুরু। আমি নিজেই প্রথমে কিছু কম্পিউটারভিত্তিক কোর্স দিয়ে শুরু করেছিলাম মনে আছে। এরপর স্বাগত জানালাম অন্যদের, অনেক সাড়াও পাই। অল্প সময়েই তিন-চার হাজার শিক্ষার্থী যোগ দেয়। দেখতাম কুইজেও অনেকে অংশ নিচ্ছে।
এরপর ভাবলাম এই শিক্ষা কেন কেবল কম্পিউটার-কেন্দ্রিক হবে? অন্য সাবজেক্টেও কেন হবে না? তারপর মূলত সব বিষয় সমন্বয় করে শিক্ষক ডট কমের যাত্রা শুরু। আর আমার পর্যবেক্ষণ ছিল—বাংলদেশে শুধুই ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরকেন্দ্রিক পড়াশোনাটা আটকে গেছে। অন্যত্র চাইলেও ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না। সাতক্ষীরার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একবার এক শিক্ষক আমাকে মেইল করেছিলেন, আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তার শিক্ষার্থীদের গণিত শেখানোর মতো কেউ নেই। এমনই পর্যায়ে আমি ভাবলাম, এরকম কিছু করতে হবে যেখানে খুব সহজে কিছু কোর্সের জন্য লেসন রেকর্ড করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া যাবে। আর আমি নিজে বিভিন্ন মাধ্যমে খুঁজতে থাকলাম আগ্রহীদের, যারা তাদের আগ্রহের জায়গাটা থেকে পড়াতে এগিয়ে আসবেন।
শুরু থেকেই আমাদের ওয়েবসাইটটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিই। কেউ যেকোনো কন্টেন্ট চাইলেই দেখে নিতে পারেন এখানে সম্পূর্ণ ফ্রি। আর শিক্ষকরাও যারা শেখাচ্ছেন তারাও বিনামূল্যে কাজ করছেন। যাই হোক, এই বিষয়গুলো সবার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হলো ইন্টারনেট। সেই কম্পিউটার বা টিভি সবার কাছে নেই, কিন্তু মোবাইল তো আছে। দশ কোটির বেশি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষায় যদি কোর্সগুলো দেওয়া যায়, তাহলে সবার জন্য উপযোগী হবে। বিদেশি ই-লার্নিং সাইটগুলো দেখে আমার অভিজ্ঞতা হয়। সেই মাফিক আমি শুরু করি, এখানে বোঝানোর জন্য আমি বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করি। ছোট ছোট করে মোবাইল উপযোগী করে লেসন তৈরি করি। আর ইন্টারনেটের বাইরে সরাসরি মেমোরি কার্ড বা টিভিতেও কীভাবে এটি দেখা যায় তার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকলাম।
প্রথমেই খরচ একটা বিষয় হয়ে দাঁড়াল। ইংরেজির জনপ্রিয় সাইট কোর্সএরার যে পরিমাণ বাজেট, তার ছোট্ট একটা অংশও আমার পক্ষে সম্ভব না। যাই হোক, নিজেই যেটুকু পারি, ওয়েবসাইট ডিজাইন করলাম। মাত্র ১৫ ডলার মানে ১২০০ টাকা খরচ করেই ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হলো। আর কুইজ বা মতামত দেওয়ার জন্য গুগলের কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করি, এতে আর তেমন কোনো খরচা হয়নি আমার। তারপর শুরু করে দিই। প্রথম ৬ মাসে প্রায় ২০০০০ মতো শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে ফেলে, এখন তা ৭০০০০ মতো। আর প্রতিদিন প্রায় ৫০০০ বার বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের কোর্সগুলো দেখে মানুষ।
এবার আসা যাক প্রচারণায়। এ ক্ষেত্রে ফেসবুক অনেক সহায়তা করেছেন। একটা পোস্ট দেখেই অনেকে পড়াতে এগিয়ে আসেন। প্রথম সপ্তাহে ২টি, দ্বিতীয় সপ্তাহেই ৫টি কোর্স চালু হয়ে যায়। তারপর এই জিনিসগুলো অর্থাত্ কোর্সের ভিডিওগুলো মোবাইলের উপযোগী করা হয়। গ্রামের দোকানগুলোর মাধ্যমেও এটা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এর পাশাপাশি রাসবেরি পাই নামে ৪-৫ হাজার টাকার মধ্যে ক্রেডিট কার্ড সাইজের ছোট্ট পিসি বানানো সম্ভব। পুরাতন টিভিতে সংযোগ দিয়েও এটা দেখা সম্ভব। আর ডিভিডি বা সিডি তো এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছে। আর এই সব সুযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের ফেসবুকের সহায়তা নেই। সোস্যাল মিডিয়া খুব সহজেই নিয়ে গেছে তৃণমূল পর্যায়ে।
শিক্ষক ডটকমের প্রাপ্তির কথা বলতে গেলে, এটা নিজের ভাষায় নিজের দেশের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে চলছে, শিক্ষার এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে? বিশ্বের অনেক দেশ আমাদের এই মডেল অনুসরণ করতে আগ্রহী হচ্ছে। তাছাড়া আমরা মাইক্রোলেসনের মাধ্যমে সীমিত সময়েই একটা জিনিস শেখাতে চাইছি, যেন কেউ অধৈর্য না হয়ে যায়। আমাদের কোর্সগুলোতেও আনা হয়েছে বৈচিত্র্য, রান্না থেকে শুরু করে, ফটোগ্রাফি, দাবা এমনকি ওয়েব ডিজাইনের কোর্সও সংক্ষেপে করা হয়েছে এখানে। প্রায় ৫৫টি কোর্স এখান থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন ভালো কোনো ফিডব্যাক পাই। জামালপুরের একটা ছেলে একবার মেইল করেছিল, কম্পিউটার সায়েন্সে পড়তে না পেরে তার যে আক্ষেপ ছিল, এখানের কোর্সগুলো করে সে তার সেই স্বপ্ন কিছুটা হলেও পূরণ করেছে। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে?
সামনের দিনগুলোতে শিক্ষক ডটকমের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে, আমরা চাই স্কুল-কলেজের কারিকুলাম অনুযায়ী এটাকে সাজাতে। যে কেউ চাইলে তা সহজে ব্যবহার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের অভাব রয়েছে কিছুটা। বা অনেকেই ভালো পড়াতে পারলেও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে আছেন। তাদেরকে কীভাবে প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসা যায়, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। ঢাকার বাইরেও অনেক শিক্ষকরা আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন, কেউ চাইলেই আমরা এগিয়ে আসব।
শেষটায় বলি, আমাদের শিক্ষক ডটকম স্বল্পব্যয়ে উন্নত একটি মাধ্যম পড়ানোর। আর নিজের ভাষায় যদি কাউকে শিক্ষিত করা যায় তাহলে সেটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। আর জিনিসগুলোও মনে থাকে। আমি চাই আগামী দিনগুলোতে অনেক মানুষকে সাথে নিয়ে আমরা যদি এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি তাহলে শিক্ষাব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই ব্যাপারে আমরা সবার আন্তরিক সহায়তা চাই।
