আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্প্রসারণের ফলে লেনদেন যেভাবে বাড়ছে ঠিক একইভাবে বেড়ে চলেছে জটিলতা। ফলে একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ অ্যাকাউন্টিং প্রফেশনাল যেকোনো ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাহিদা অনেক এবং এই প্রজন্মের কাছেও তা জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তা এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন মেধাবী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। আয়োজনটি গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
মো. আব্দুস সাত্তার সরকার
হেড অব ফিন্যান্স, ব্র্যাক
নাটোর জেলার একটি ছোট গ্রাম বিরাহীমপুরে, মধ্যবিত্ত এক কৃষক পরিবারে জন্ম তার। তিন ভাইবোনের পরিবারে আনন্দ-উচ্ছলতাতেই কেটেছে তার শৈশবের দিনগুলো। স্থানীয় স্কুলেই তার পড়ালেখার হাতেখড়ি। কসবা প্রাইমারি স্কুল থেকে পাস করে, কাফুরিয়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি পাস করে নাটোর সিরাজউদ্দৌলা সরকারি কলেজে ভর্তি হন। এরপর ১৯৮৬ সালে পাস করে তেজগাঁও কলেজ এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে এমকম ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি আইসিএমএ এবং সিএ পেশায় লেখাপড়া করে দুইটি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি আব্দুস সাত্তার সরকার, একজন প্রতিভাবান চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট তিনি। গ্রামীণ ব্যাংক ও তার একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করে তিনি যোগ দেন ব্র্যাকে। কয়েক ধাপে পদোন্নতি পেয়ে নিজের মেধার যোগ্যতায় তিনি এই প্রতিষ্ঠানের হেড অব ফিন্যান্সের পদে কাজ করেছেন। দক্ষতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি ২০১৩ সালে ‘ব্র্যাক ভ্যালু’স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। আব্দুস সাত্তার এই পেশায় অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বলে জানালেন। কারণ এখানে কাজের অনেক সুযোগ আছে। আমাদের দেশে পেশা হিসেবে দিন দিন এ সেক্টরটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, কারণ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে এবং নতুন নতুন অনেক সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হচ্ছে।
নতুনদের জন্য আব্দুস সাত্তারের পরামর্শ—যে, যে বিষয়েই লেখাপড়া করুক না কেন ভালোভাবে পড়তে হবে এবং বিষয়ের গভীরে যেতে হবে। তাহলেই সেটার সম্পর্কে আসল জ্ঞান অনুধাবন করা সম্ভব। সাত্তার স্বপ্ন দেখেন, আমাদের দেশে এ ধরনের পেশার কদর সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে। নতুন প্রজন্ম যতই এগিয়ে আসবে, নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে এই পেশা। একজন আব্দুস সাত্তার সরকারের মতো একাগ্রচিত্তের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরাই পারেন আমাদের সেই লক্ষ্য পূরণ করতে।
মো. আব্দুস সাত্তার সরকার
ডাকনাম :সাত্তার
জন্ম তারিখ ও স্থান :০৬ অক্টোবর, নাটোর
মায়ের নাম :সামেনা খাতুন
বাবার নাম :মো. আজিম উদ্দিন সরকার
প্রথম স্কুল :কসবা প্রাইমারি স্কুল, কসবা, পীরগঞ্জ, নাটোর
প্রিয় মানুষ :বাবা এবং মা
প্রিয় উক্তি :যেখানে পরিশ্রম মূলধন সেখানে সাফল্য ১০০%
প্রিয় পোশাক :পায়জামা, পাঞ্জাবি
অবসর কাটে যেভাবে :পত্রিকা পড়ে, টিভি দেখে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানো।
===
মো. নাজমুল ইসলাম
জিএম, দাদা গ্রুপ (সহযোগী প্রতিষ্ঠান যমুনা গ্রুপ)
একটি স্পেশালাইজড কোর্স হচ্ছে প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টিং, যা বিশেষ ক্যারিয়ারভিত্তিক প্রফেশনাল কোর্স। নাজমুল ইসলাম তেমনটা বুঝতে পেরেই একজন সিএ প্রফেশনাল হিসেবে নিজেকে তৈরি করেন। একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তিনি এখন কর্মরত রয়েছেন যমুনা গ্রুপের শীর্ষ পদে। নাজমুল ইসলাম ১৯৯৫ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৯৭-এ কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে ২০০২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টিং থেকে বিকম এবং এমকম করেন। সিএ পার্ট-১ ও সিএ (সিসি) করেন ২০০৫ সালে। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ফিন্যান্স বিষয়ে এমবিএ করেন ২০১০ সালে। তিনি সে বছরই ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার (আইটিপি) শেষ করেন। নাজমুল ইসলামের প্রথম চাকরি ইউনিলিডার নামে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে। এটি এনএ বাগ ইন্ডাস্ট্রির একটি কোরিয়ান কোম্পনি। তারপর এ কে বোর্ড অ্যান্ড ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি কর্পোরেট জিএম হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি জিএম হিসেবে যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান দাদা গ্রুপের জিএম হিসেবে যোগদান করেন। নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি বা সিএ পড়তে চান অনেকেই। এ ডিগ্রির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। একটু পরিশ্রমী হলেই এ ডিগ্রি নেওয়া সম্ভব। ’ এ পেশায় তরুণদের আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন তিনি। কুমিল্লার কালিয়াজরি গ্রামে তার ছোটবেলা কেটেছে। তার বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, তিনি বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছেন। মা গৃহিণী। চারভাই ও চার বোনের পরিবার। বর্তমানে এক ছেলে এক মেয়ে নাবিলা আর মাহাদিকে নিয়েই কাটে তার অবসর সময়। তার স্ত্রী মাসুমা বেগম একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা। সামনের দিনগুলোতে নিজের কাজের ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগি হতে চান নাজমুল। তিনি তার স্বপ্নের পথ ধরে এগিয়ে যাবেন—এই প্রত্যাশা।
মো. নাজমুল ইসলাম
ডাকনাম :অপূর্ব
জন্ম তারিখ ও স্থান :১০ জুলাই, ময়মনসিংহ
মায়ের নাম :আশরাফুন নাহার
বাবার নাম :মফিজুল ইসলাম
প্রথম স্কুল :পিটিআই স্কুল
প্রিয় মানুষ :মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট সাফল্যের সংজ্ঞা :কঠোর পরিশ্রম।
===
গোপাল চন্দ্র ঘোষ
কাউন্সিল মেম্বার, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টেস অব বাংলাদেশ
বাগেরহাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করত তাকে। তার সবচেয়ে ভালো লাগত নদীপথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া। বাগেরহাট টাউন স্কুল ও বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে। এরপর ভর্তি হন দেশসেরা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে। পারিবারিক আগ্রহে ব্যাবসা শিক্ষা পড়া শুরু করলেও একসময় নিজের কাছেই ভালো লেগে যায় বিষয়টি। ঢাবিতেও যথারীতি ভালো রেজাল্ট করলেন। যেকোনো চাকরিই করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই পথে হাঁটেননি। নিজের মেধাকে ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে কিছু করার জন্য জন্য সিএ করেন। তখনকার দিনে সিএ পাস করতো মাত্র শতকরা দুই ভাগ। দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে পড়াশোনা করে ১৯৯৭ সালে তিনি সিএ কোয়ালিফাইড হন। তিনি কাউন্সিল মেম্বার এবং দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, দ্য কনটিনিউয়িং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট কমিটি অব আইসিএবি-এর চেয়ারম্যান, দ্য ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি এফসিএ, এফসিএমএ, এফআইপিএ-এর ফেলো মেম্বার। তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে আইসিএবি-তে সিএ-র বিভিন্ন বিষয়গুলো পড়াচ্ছেন। তিনি আতিক খালেদ এন্ড কোং-এ কনসাল্টিং ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করছেন। তাছাড়া তিনি বিশ্ব ব্যাংকের বিভিন্ন প্রোজেক্টের কাজ করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার পরই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তার স্ত্রী গোপা ঘোষ সিডনি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষিকা। মেয়ে সূচী মায়া ঘোষ সবেমাত্র কেজিতে পড়ছে। তাদেরকে নিয়েই মধ্যবাড্ডায় থাকেন তিনি। ভবিষ্যতে তিনি হিসাব নিরীক্ষা পেশায় উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ তৈরিতে অবদান রাখতে চান। সাথে সমাজের বিভিন্ন স্তরে উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিজেকে আরও সম্পৃক্ত করতে চান এই সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
গোপাল চন্দ্র ঘোষ
ডাকনাম :গোপাল
জন্ম তারিখ ও স্থান :২১ জুলাই, বাগেরহাট
মায়ের নাম :মীরা ঘোষ
বাবার নাম :চিত্ত রঞ্জন ঘোষ
প্রথম স্কুল :মূলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :নেলসন ম্যান্ডেলা ও শচীন টেন্ডুলকার
প্রিয় উক্তি :Never give up.
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজেকে সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত করা ও নিজের যোগ্যতার প্রকাশ ঘটাতে পারা।
