মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাসহ সকল সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান চায় বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ, ব্যবস্থাপনাসহ সবক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মিয়ানমারও এ উদ্যোগে সম্মত। চলতি জুন মাসে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সীমান্ত ও কূটনৈতিক পর্যায়ের বৈঠকে স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে বলে বাংলাদেশ সরকার আশা করছে। এমন কি নিরাপত্তা ইস্যুতেও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে চায় বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ইতিমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। গত ২৮ থেকে ৩০ মে সীমান্তে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) একতরফা গুলিবর্ষণ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক মিজানুর রহমানকে গুলি করে হত্যা, একতরফাভাবে সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ তাত্ক্ষণিকভাবে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জোর প্রতিবাদ জানায়। বাংলাদেশে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থানকে দুই দফা তলব করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুরূপ প্রতিবাদপত্র পাঠায়। বিজিবি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর পাশাপাশি কার্যকর ভূমিকা নেয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমারের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে পাঁচজন লোক নিহত হয়। এরপর মিয়ানমার পক্ষ অভিযোগ করে, রোহিঙ্গা সলিডারিটি সংস্থার (আরএসও) সদস্যরা এ ঘটনা ঘটায়। বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে আর এসও সদস্যরা অবস্থান করছে ও প্রশিক্ষণ নিয়ে মিয়ানমারে কখনো কখনো অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশে আরএসও-এর ঘাঁটি রয়েছে বলে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের কাছে অভিযোগ করে। তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ এ অভিযোগ নাকচ করে এবং কোন ঘাঁটি নেই বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেয়। আরএসও-এর ঘাঁটি সংক্রান্ত তথ্য থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে বাংলাদেশ জানায়। প্রয়োজনে নিরাপত্তা বৈঠক করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কখনো কোন সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়া হয় না বলে বাংলাদেশ জানিয়ে দেয়।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল ও জল সীমান্তে সব ধরনের উত্তেজনা আর অস্থিরতার অবসান চায় বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ৩১৪ দশমিক ৪০ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে স্থল সীমান্ত। নাফ নদী সংলগ্ন সীমান্ত রয়েছে ৬৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার। আর ৩৯ কিলোমিটার হল সমুদ্র সীমা। নিরাপত্তাসহ সকল প্রকার সীমান্তসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী কাঠামো নিয়ে কাজ করছে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আগামী ৯ থেকে ১৪ জুন মিয়ানমার সফর করবে। তখন সার্বিক সীমান্ত নিয়ে আলোচনা হবে। অন্যদিকে দু’দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আগামী ১৮ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ৫ জুন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবি ও বিজিপির সীমান্ত পতাকা বৈঠক ডাকা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, শনিবার থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তবে এর আগের ঘটনাগুলো আসন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে আলোচিত হবে। উত্তেজনা আপাতত কমে আসলেও স্থায়ী সমাধান দরকার। দু’দেশের মধ্যে সিকিউরিটি ডায়লগও প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী গতকাল রবিবার বিকালে সাংবাদিকদের জানান, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসাবে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ককে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। দেশটির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ও বিকাশমান সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে চাই। সে ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী। দ্বিপাক্ষিক সব পর্যায়ে যোগাযোগ ও আলোচনা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকায় ১৮ জুন অনুষ্ঠেয় দু’দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা সব সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে চাই। সেজন্য নিবিড়ভাবে আলোচনাও করব। সীমান্তে যখনই কিছু হচ্ছে তখনই সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে
-স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
এদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সীমান্তে বিজিবি সদস্য নিহতের ঘটনা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে যে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটেছে, তার অবসান হয়েছে। গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে একই কক্ষে দেশের আইন- শৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতি ও মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ সীমান্ত সদস্য নিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমানসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সীমান্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে কীনা -সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমান্তের যে কোন সমস্যা মোকাবিলায় বিজিবি যথেষ্ট। তবে আমরাও সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে পারি। কিন্তু আমরা তা করবো না। আমরা দুই দেশের মধ্যে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। সীমান্তে মিয়ানমার যে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে তা অচিরেই প্রত্যাহার করবে বলে আমি আশাবাদী।
