দরকার গ্রামমুখী উন্নয়ন নীতি

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৪, ২১:৫০
সামপ্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের বসবাস অযোগ্য ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৯। এ যেন এক আতঙ্কের তথ্য। জনসংখ্যার আধিক্য, জীবনযাত্রার নিম্ন মান, অতিমাত্রায় দূষিত পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থার বেহাল দশা, নিরাপত্তাহীনতা—এ সবকিছু মিলেই ঢাকাকে অবসবাসযোগ্য শহর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। তবু প্রতিদিন মানুষ ছুটছে শহর পানে। শুধু ঢাকা শহর নয়, দেশের সকল শহরই ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থায় আছে। নাগরিক সুবিধাসমূহ অতিমাত্রায় শহরকেন্দ্রিক, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, চিকিত্সা, কর্ম, বিনোদন প্রায় সকল জৈবিক সুবিধার জন্যই মানুষ আজ শহরমুখী। খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে শহরের কাঁচাবাজারে গিয়ে পাবেন তরতাজা শিশির মাখা সবজি ( যদিও তা কৃত্রিম অথবা রাসায়নিক উপাদানে সমৃদ্ধ), দাম নাগালের মধ্যে না থাকলেও দেখবেন বিশাল বড় রুই মাছ যেটা নড়েচড়ে প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। অন্যর্িদকে গ্রামের বাজারে এই বড় মাছ উত্সবে পার্বণেও খুঁজে পাবেন না। অথচ এই মাছ গ্রামেরই কোনো পুকুরে চাষ হয়ে বেশি দামের আশায় চলে আসে শহরে। গ্রামের কোনো মেধাবী সন্তান চায় উচ্চশিক্ষা, তার জন্য দৌড়াতে হবে শহরে। পড়াশোনা শেষে কাজ দরকার, সেটার জন্যও যেতে হবে শহরে। কেউ গুরুতর অসুস্থ, দরকার ভালো চিকিত্সা, সেটাও সেই শহরে। কেউ গ্রামের চায়ের দোকানের রাজনীতি ছেড়ে বড় নেতা হতে চান, তার জন্যও যেতে হয় শহরে আরো বড় নেতার আশীর্বাদ নিতে। চোর, বদমাশ, সন্ত্রাসী তারাও দৌড়ায় শহর পানে। আর কিছু মানুষ দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য চরম এক অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে শহরমুখী হয়। আবার গ্রামে যাদের বিত্ত আছে তারা আধুনিক জীবনের টানে সোনার দামে আবাসন কিনে নগরের নাগরিকত্ব লাভ করে। হয়তো সোনার সঙ্গে নগরের আবাসনের তুলনা করলে, নাগরিক আবাসনকে অবমূল্যায়ন করা হবে। টাকা থাকলেই সোনা কেনা যায়, সোনার গয়না ব্যবহার করা যায়। কিন্তু শহরের আবাসনের জন্য টাকা এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষমতা থাকা চাই। এভাবেই এক বুক স্বপ্ন, অনিশ্চয়তা আর ক্ষমতা নিয়ে মানুষের দৌড়ের প্রধান গন্তব্য হয়েছে ঢাকা এবং তার পর অন্যান্য শহর। কিছুদিন আগে আমার এক সিলেটি বন্ধু সিলেটের শহরতলিতে এক টুকরো জমি কিনেছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিয়ে। তার জন্মস্থান সিলেটের হবিগঞ্জ জেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে তাদের সুন্দর একটি বাড়িও আছে। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে প্রতিদিন শহরে এসে শিক্ষা নেওয়া তো দূরের কথা জরুরি চিকিত্সাসেবার জন্যও জেলা সদরে যাওয়া দুরূহ ব্যাপার। আর তাই সে প্রবাসের কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়ে এক টুকরো জমি কিনে এখন ভাবছে জমির ওপর বাড়ি বানানোর অর্থ সে কোথায় পাবে? শুধুমাত্র যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হলে কষ্টে অর্জিত এই টাকা দিয়ে শহরে জমি না কিনে গ্রামে থেকেই শহরে গিয়ে আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিতে পারতো। এই টাকাটা অবদান রাখতো আমাদের অর্থনীতির অন্য কোনো খাতে। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে মানুষ শহর থেকে একটু দূরে নিরিবিলিতে বসবাস করতে ভালোবাসে। নিউইয়র্ক শহরে মানুষ ২০০ কিলোমিটার দূর থেকে দিনে এসে কাজ শেষে দিনেই ফিরে যায়। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার জন্যই সেটা সম্ভব হয়। আমাদের ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে দেরি হলেও অন্য শহরগুলোকে বাঁচানোর জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগ। প্রথমেই দরকার গ্রামমুখী উন্নয়ন নীতি। গ্রামের উন্নয়নের মাধ্যমে শহরের নাগরিক সুবিধাসমূহ পৌঁছে দিতে হবে গ্রাম পর্যায়ে। করতে হবে সরকারি-বেসরকারি সেবা ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দী্রকরণ। যেন সকল সেবার জন্য মানুষকে শহরমুখী না হতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে, দাম কমাতে হবে মোটর গাড়ির, বিদ্যুত্ব্যবস্থা ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিভেদ দূর করতে হবে। দেশের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চিকিত্সা কেন্দ্রের শাখা বিস্তার করতে হবে গ্রামের মানুষের নাগালের মধ্যে। কর্মক্ষেত্রগুলো শহরকেন্দ্রিক না রেখে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে গ্রাম পর্যায়ে। আর এ সবগুলোর জন্য চাই সরকারি-বেসরকারিভাবে আন্তরিক গ্রামমুখী উন্নয়ন নীতি। মানুষ গ্রামে বাস করেও পাবে শহরের নাগরিক সুবিধা। শহরমুখী মানুষের স্রোত কমবে, মানুষ হবে গ্রামমুখী। ফিলিপাইন