বলতে গেলে ভেজাল নাই এমন খাবার পাওয়া-ই মুশকিল। তরিতরকারি থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ফল-ফলাদি, বিস্কুট,চানাচুর কোনো কিছুই নিরাপদ নয়।
খাদ্যপণ্যে ব্যবহূত হয় টেস্টিং সল্ট, খাওয়ার সোডা, ফুড ফ্লেভার যা লিভার ও কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করে। ফরমালিন,হাইড্রোজ,কার্বাইড এবং ইথোফেন ব্যবহূত হয় মাছ ও ফলের পচন রোধ করতে, জিলাপি মচমচে করতে, মুড়ি বেশি ফোলাতে, ফল পাকাতে এবং রঙ ভালো করতে। আবার ডিডিটি ও টেক্সটাইল রঙ ব্যবহূত হচ্ছে শুঁটকি মাছ, মরিচ, হলুদ,ধনিয়া, মসলা ও আইসক্রিমে। এসব রাসায়নিক দ্রব্য ক্যান্সার পর্যন্ত ঘটাতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, বাচ্চাদের জন্য যে লিচু বা আমের জুস তৈরি করা হয়,তাতে লিচু বা আমের কোনো অস্তিত্বই নেই। কৃত্রিম লিচু বা আমের গন্ধ দিয়ে এসব জুস বানানো হচ্ছে। চকলেটের মধ্যে চিনির পরিবর্তে স্যাকারিন ব্যবহার করা হচ্ছে অহরহ।
আমাদের সংবিধানে অনুচ্ছেদ নম্বর ১৫ এবং ১৮-এ বলা আছে— সরকার জনগণের খাদ্য নিশ্চিত করবে এবং পুষ্টিকর খাদ্য উত্পাদন বা সরবরাহ-ই হবে সরকারের অন্যতম কাজ। কিন্তু সরকার আজ সেখানে ব্যর্থ। ১৮৬০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ২০টির বেশি ভেজালবিরোধী আইন হয়েছে। তার মধ্যে জাতীয় খাদ্য নীতি ২০১০-এ নিরাপদ খাদ্য আইনগুলো আধুনিক করতে এবং ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একত্র করতে বলা হয়েছে। জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনীতি ১৯৯৭-এ খাদ্য মান মনিটরিং করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য নীতি-২০০৫-এ বিষাক্ত অথবা ক্ষতিকারক রাসায়নিকযুক্ত খাবার বিক্রি অথবা উত্পাদন বন্ধের জন্য বলা হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি নীতি ২০০৬-এ সার্টিফিকেট এবং বিভিন্ন পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। ১৯৫৯ সালের Pure Food Ordinance কে পরির্বতন ও পরিবর্ধন করে যুগোপযোগী নতুন আইন ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ সংসদে পাস হয়েছে। এই আইনে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
এসব আইনের বাস্তবায়ন নেই। হোটেলগুলোতে মৃত মুরগি খাওয়ানো হচ্ছে। আজো ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একত্র করা হয়নি। ফরমালিন এবং ডিডিটি খাবারে পাওয়া যাচ্ছে নিয়মিত। এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ-ই ২০২৫ সালের মধ্যে শুধুমাত্র ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করার ফলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন জনসচেতনতা। প্রথমে ব্যক্তিকে বুঝতে হবে এর ক্ষতিকর দিকটি। সর্বোপরি আইন বাস্তবায়ন নির্ভর করে যিনি আইন প্রয়োগ করবেন তাঁর ওপর। তিনি যদি দক্ষ এবং স্বচ্ছ না হন তাহলে মানুষ কুফলও পেতে পারে। উন্নত দেশে কোনো ওষুধের দোকান দিতে হলে, গোয়েন্দা সংস্থা তার তিন পুরুষ যাচাই করে দেখে। দেশে ওষুধে ভেজাল পরীক্ষা করার জন্য যে ড্রাগ-ল্যাবরেটরি তৈরি করা হয়েছে সেখানে-ই সব রাসায়নিক মিশ্রণ পরীক্ষা করা সম্ভব। সরকারের নতুন করে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। শুধু এর সঙ্গে খাদ্যকে একত্র করে সিদ্ধান্ত নিলেই এটা সম্ভব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে Food and Drug Administration একত্রে কাজ করে, কোথাও আলাদা নেই।
ভোক্তাকে তার অধিকার জানতে হবে। বেঁচে থাকার স্বার্থেই এখন তা জরুরি হয়ে পড়েছে। নয়তো আগামী প্রজন্ম নিমজ্জিত হবে গভীর অন্ধকারে। আর দেশের উন্নয়ন, সে হবে এক কঠিন কাজ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
