আবারো আলোচনায় এসেছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ির গহীন অরণ্যের নাম। ২০০৩ সালে বগুড়ায় একটি গোলাবারুদ ভর্তি ট্রাকের চালান আটক করা হয়। ওই চালানটি আসছিল এই সাতছড়ি থেকেই। গতকাল মঙ্গলবার সেই সাতছড়ি থেকেই ১৮৪টি ট্যাংক বিধ্বংসী গোলা ও ১৫৩টি রকেট চার্জার উদ্ধার করল র্যাব। জানা গেছে, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গোলাবারুদ এগুলো। এখান থেকে অস্ত্রের চালান আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে যেত।
সাতছড়িতে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্রের ভান্ডার থাকতে পারে- বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এমন সন্দেহ করছিল বেশ আগ থেকেই। কিন্তু নির্দিষ্ট করে সেটি খুঁজে পায়নি এতদিন। গতকাল সকালে র্যাব যেটা হবিগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা চুনারুঘাটের সাতছড়ি গহীন অরণ্যে খুঁজে পেল। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে গোলাবারুদ উদ্ধার কার্যক্রম। আজ বুধবার র্যাব সদস্যরা উদ্ধার অভিযান পুনরায় শুরু করবে বলে জানান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান।
২০০৩ সালের ২৭ জুন বগুড়ার কাহালু উপজেলার নাগরনদের অববাহিকায় যোগারপাড়া গ্রামে ইয়াছিন আলীর ইটের ভাটা থেকে পুলিশ ৯৯ হাজার ৯৮৯টি চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও ১৭৪ কেজি বিস্ফোরকসহ একটি ট্রাক আটক করে। আনারসের আড়ালে গুলি ও বিস্ফোরক ভর্তি এই ট্রাকটি আসে এই সাতছড়ির গহীন অরণ্য থেকে। সে সময় ওই ঘটনাটি দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় কাহালু ও দুপচাঁচিয়া থানায় ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে এ মামলাটি সিআইডি দীর্ঘদিন তদন্ত করে। তদন্তেও বের হয়ে আসে গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্যের চালানটি চুনারুঘাটের সাতছড়ির গহীন অরণ্য থেকে আসে। গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য বহনকারী ট্রাকটির (ঢাকা-মেট্রো-ট-১১-৩৩৬৬) মালিক হবিগঞ্জের চুনারুঘাট সাতছড়ির আশীষ দেব বর্মা। ঘটনার পর থেকে সে পলাতক। এখনও আলোচিত এ গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্যের মামলার প্রকৃত আসামিরা প্রেফতার হয়নি। তারা থাকছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ঘটনার পর মামলা তদন্ত কাজে বিভিন্ন মহল থেকে ওই সময় নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। সিআইডি দায়সারা গোছের একটি চার্জশিট দেয় আদালতে। এই দুর্বল চার্জশিটের কারণে মামলাটির ভবিষ্যতে অন্ধকার নেমে আসে বলে জানান এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
সাতছড়ি গহীন অরণ্যে থাকে ত্রিপুরা রাজ্যের বাসিন্দারা। জানা গেছে, ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (এনএলএফটি) বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের সদস্যদের অস্ত্রের চালান এখানে এনে মজুদ রাখা হতো। এ অস্ত্রের ভাণ্ডার থেকে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। এ সব কার্যক্রম ওই বাসিন্দারা দেখতেন। বাঙালিরা ওই এলাকায় যাতায়াত করতে পারতো না। এনএলএফটি গ্রুপের সদস্যরা কঠোর সশস্ত্র পাহারায় রাখতো এ এলাকাটি। মূলত এনএলএফটির দখলেই ছিল পুরো গহীন অরণ্যটি। পাশে মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার গহীন অরণ্যে ছিল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) অস্ত্র ভাণ্ডার। উভয় বিচ্ছিন্নতাবাদীর মধ্যে সমন্বয় ছিল।
২০০৬ সালে এপ্রিল মাসে র্যাবের একটি বিশেষ দল ওই গহীন অরণ্যের অস্ত্র ভাণ্ডারের সংবাদ পেয়ে অভিযানে গেলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সদস্যদের সঙ্গে গুলি বিনিময় হয়। উভয় পক্ষের গুলি বিনিময়ে ৫ জন ত্রিপুরাবাসী নিহত হয়। এই সকল নিহত পরিবারের সদস্যরা গহীন অরণ্যের আশেপাশের আদিবাসীদের বেশ কয়েকজনকে সন্দেহ করছিল। তারা মনে করে ওই সকল আদিবাসী র্যাবকে নিহতদের সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল। ওই সকল আদিবাসীদের বেশ কয়েকজনের সন্তান ঢাকার উত্তরা মাইলস্টোন কলেজে পড়াশুনা করতো। তারা উত্তরার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতো। ২০০৬ সালে মাইলস্টোনের আদিবাসী ৪ ছাত্রকে জবাই করে ওই ফ্ল্যাটে হত্যা করা হয়। এই চার ছাত্র হত্যাকাণ্ডের পিছনে সাতছড়ির গহীন অরণ্যে নিহত ৫ ত্রিপুরার স্বজনরা জড়িত বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়। গতকাল সাতছড়ি গহীন অরণ্য অস্ত্র ভাণ্ডার সন্ধানের পর চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান, বগুড়ার গুলি ও বিস্ফোরকের চালান এবং উত্তরা আদিবাসী ৪ ছাত্র হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়। গতকাল অস্ত্র ভাণ্ডারের সন্ধান লাভের পর ওই সকল ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এছাড়া ২০০২ সালে ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট থেকে দুই দফা বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে। সে সব অস্ত্র উলফাদের ছিল বলে জানা যায়।
