সৌদি আরবের রিয়াদে শিফা সানাইয়া এলাকায় সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুমিল্লার ৭ জনের মধ্যে বাকি ৩ শ্রমিকের মরদেহ বুধবার তাদের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের লাশ স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হলে রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছায়। এসময় পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এর আগে গত শুক্রবার কুমিল্লার ৪ জনের মরদেহ দেশে আনার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জানা যায়, বুধবার সকাল ৯টার দিকে জেলার তিতাস উপজেলার দক্ষিণ নারান্দিয়া গ্রামের চকবাড়ি জামে মসজিদের সামনে ঐ গ্রামের নাজির হোসেনের (৩২) নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোমনা উপজেলার চান্দেরচর গ্রামে ওই গ্রামের বাহাউদ্দিনের (২৭) এবং সাড়ে ১১টার দিকে মেঘনা উপজেলার শিবনগর গ্রামের শিবনগর স্কুল মাঠে ওই গ্রামের আবদুল গাফ্ফারের (৩৫) জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নিহতদের মরদেহ তাদের নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
একমাত্র সন্তানকে দেখা হলো না বাহাউদ্দিনের: নিহত বাহাউদ্দিনের ভাতিজা নূরে আলম বাবু হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে জানান, পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে বিয়ের ২ মাস পর ও ১৬ মাস আগে সৌদি আরব যান তার চাচা বাহাউদ্দিন। বিদেশে যাওয়ার পর একমাত্র পুত্র সন্তান আবদুল্লাহ্ (১৪ মাস) জন্মগ্রহণ করে। তাকে দেখার জন্য কয়েকবার দেশে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও আর্থিক অনটনের কারণে তার আর দেশে আসা হয়নি। তার পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে হত-বিহবল হয়ে পড়েছে।
পরিশোধ করা হলো না নাজিরের ঋণের টাকা: তিতাস উপজেলার দক্ষিণ নারান্দিয়া গ্রামের নিহত নাজিরের ঋণের টাকা পরিশোধ করা হলো না। ছেলেহারা মা জুলেখার গগণবিদারী আহাজারি কে আটকে রাখে? নাজির ১২ বছর যাবত্ সৌদিতে চাকরিরত। অভাব অনটনের কারণে ১২ বছরের মধ্যে একবারও দেশে আসেননি নাজির। ৫ ভাইয়ের মধ্যে নাজির দ্বিতীয়। ছোট ভাই আজিজুল হক জানান, আগামী ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসার কথা জানালেও এসেছে আমার ভাইয়ের মরদেহ।
বিয়ে করা হলো না গাফ্ফারের: নিহত আবদুল গাফ্ফারের চাচা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ জানান, ভাগ্যের অন্বেষণে গাফ্ফার বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছে। তার পিতা নূরুল ইসলামকে পুত্র গাফফারের কথা জিজ্ঞেস করতেই বুক চাপড়ে হাউমাউ করে কেঁদে জানান, ৯ বছর ৭ মাস পূর্বে ধার-দেনা করে তাকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলাম। প্রথম যে কোম্পানিতে সে চাকরি নেয় সেখানে ৪ বছর তাকে বিনা বেতনে খাটায়। পরবর্তীতে কোম্পানি পরিবর্তন করে কিছু অর্থ উপার্জন শুরু করলেও সর্বনাশা আগুন তাকে বাঁচতে দেয়নি। মৃত্যুর ২ দিন আগে ছোট বোনকে ফোনে জানিয়েছিল রোজার ঈদে ছুটিতে বাড়ি এসে বিয়ে করবে। তার মা ছালেহা বেগম জানান, ছেলের বিয়ের জন্য বউ দেখা হচ্ছিল। সে আশা আর পূরণ হলো না। একমাত্র উপার্জনক্ষম গাফফারকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশাহারা।
উল্লেখ্য, গত ১২ মে রাতে সৌদি আরবের রিয়াদে ‘তিতাস ফার্নিচার’ নামক একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত ৯ বাংলাদেশির মধ্যে ৭ জনের বাড়ি কুমিল্লায়। এদের মধ্যে জেলার হোমনার ৩ জন, তিতাসের ৩ জন ও মেঘনা উপজেলার ১ জন।
