শিক্ষা মৌলিক অধিকার, কিন্তু বিশ্বের সকল মানুষ এই অধিকার ভোগ করে না। আজও পৃথিবীর সব শিশু স্কুলে যাইতেছে না। ২০১১ সালেও সারাবিশ্বে ৫ কোটি ৭০ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাহিরে থাকিয়া গিয়াছে। অথচ বৈশ্বিক সংস্থাগুলি ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কর্মসূচি লইয়া বহু বছর ধরিয়াই কাজ করিয়া যাইতেছে। কিন্তু ইহার ফলাফল এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক নহে। বিশ্বে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হইয়াছিল ২০১৫ সাল। সেই হিসাবে নির্ধারিত সময়সীমা অতি সন্নিকটে। কিন্তু ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হইয়াছে, এই লক্ষ্য অর্জিত হইবে না। রবিবার বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ভবনে ‘সবার জন্য শিক্ষা গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৩-১৪’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল যৌথভাবে ইউনেস্কো, সেভ দ্য চিলড্রেন, বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন (বিএনসিইউ) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতেই সর্বজনীন শিক্ষাসংক্রান্ত এইরূপ আশঙ্কা ব্যক্ত করা হইয়াছে।
প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিশ্বের বিদ্যালয়-বহির্ভূত শিশুর অর্ধেকের বসবাস সংঘাতময় দেশগুলিতে। অর্থাত্ প্রায় ছয় কোটি শিশু যে যেকোনো রকম শিক্ষার বাহিরে থাকিয়া যাইতেছে, তাহা কেবল অসচেতনতার অভাবে হইতেছে না। বিদ্যালয়ে না যাইবার পরিস্থিতি প্রায় অনতিক্রম্য। কারণ যে বিশ্বব্যবস্থা ও বিশ্বঅর্থনীতির মধ্যে আমরা অবস্থান করিতেছি, তাহাতে যুদ্ধ-সংঘাত অনিবার্যরূপে দেখা যাইতেছে। বিশ্বে সংঘাত যেমন জাতিগত, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী। মধ্যযুগীয় দখলদারির প্রবণতা হইতে বিশ্ব আজও মুক্ত নহে। আবার যুদ্ধ-অর্থনীতির দিকটিও টিকিয়া রহিয়াছে ক্ষমতাধর অস্ত্র কোম্পানি ও তাহার প্রশ্রয়দাতা ততোধিক ক্ষমতাধর সরকারগুলির কারণে। সংঘাত চলিতেছে পৃথিবীর নানান কোণে, সংঘাতমুক্ত পৃথিবী যেন কোনোদিনই আর পাওয়া যাইবে না। ফলস্বরূপ সংঘাতময় দেশ ও অঞ্চলে বিদ্যালয় বন্ধ থাকিবে এবং শিশুরা পিদ্যাপীঠে পদার্পণ না করিয়াই তাহার মূল্যবান শৈশব অতিক্রম করিবে। ২০০৮ সালে সংঘাতের কারণে শিশুদের বিদ্যালয় গমন বন্ধ থাকিবার হার ছিল ৪২ শতাংশ। অর্থাত্ এই প্রবণতা হ্রাস না পাইয়া বৃদ্ধি পাইয়াছে। অন্যদিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে, সংঘাতময় দেশসমূহের ২ কোটি ৮৫ লাখ বিদ্যালয়-বহির্ভূত শিশুর ৯৫ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশসমূহে। সেইক্ষেত্রে কর্মসূচির আওতায় থাকা ৯০টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৩টি দেশে ২০১৫ সালের মধ্যে ৯৭ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সমাপনী উত্তীর্ণ হইতে পারিবে। অবশ্য বাংলাদেশের পরিস্থিতি সেই তুলনায় বেশ ভালো। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তির হার ৯৯.৪৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ২০১৫ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করিতে ১০ লাখ ৬০ হাজার নূতন শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকারসমূহকে উদ্যোগ লইতে হইবে। ইহাতে উত্তম শিক্ষক সরবরাহের চারটি কৌশল চিহ্নিত করা হইয়াছে। এইগুলি হইলো শিশুদের ভিন্নতাকে মানিয়া লইয়া শিখন নিশ্চিত করা; শিক্ষকদের অবশ্যই প্রশিক্ষণ দেওয়া যেন তাহারা প্রারম্ভিক শ্রেণি হইতেই দুর্বল শিক্ষার্থীদের সহায়তা করিতে পারেন; দেশের সবচেয়ে সমস্যাসংকুল এলাকায় সবচেয়ে ভালো শিক্ষক প্রেরণ এবং শিক্ষকদের সঠিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। তবে এইসকল উদ্যোগ গ্রহণ করিবার পরও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হইবে কি না তাহা লইয়া সংশয় থাকিয়াই যাইতেছে।
