সাতছড়ির পাহাড়ে ৭ বাংকার ও কূপ
দ্বিতীয় দিনে মিলেছে :১টি রকেট লঞ্চার, ৩৮টি রকেট, ৯৫টি রকেট চার্জার, ৪টি মেশিনগান, ৫টি মেশিনগানের ব্যারেল, ছোট-বড় অস্ত্রের আড়াই হাজার গুলি
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে পাহাড়ে কূপ খুঁড়ে ও বাংকার থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ চীনের তৈরি। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারকারী র্যাবের গোয়েন্দা দলের সদস্যরা মনে করছেন, এগুলো ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ ‘অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স’ (এটিটিএফ) বা ‘ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা’র (এনএলএফটি) সদস্যদের। ২০০৩ সালে বগুড়ার কাহালুতে গোলাবারুদের ট্রাক ধরা পড়ার পর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ব্যাপক অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ওই অভিযানের মুখে নিজেদের সংগ্রহে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ তখন সরিয়ে নিতে পারেনি গ্রুপগুলো। তাদের কোন একটি গ্রুপ পাহাড়ে কূপ ও বাংকার খুঁড়ে এগুলো রেখে দেয়। যা অন্তত ১০ থেকে ১২ বছর পর উদ্ধার হলো। তবে এই অভিযান চালানোর সময় র্যাবের গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদের সংগ্রহে থাকা বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ তখন অনেকটা সস্তায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। উদ্ধার করা এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের সঙ্গে চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র ও বগুড়ার কাহালুতে উদ্ধার করা গোলাবারুদের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। সাম্প্রতিককালে এই এলাকায় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তত্পরতা নেই বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাছাড়া র্যাব-পুলিশের তত্পরতায় এই মুহূর্তে বাংকার বানানোর সুযোগও নেই।
নতুন করে উদ্ধার হয়েছে যেসব গোলাবারুদ
র্যাবের অভিযানে বের হয়েছে তিনটি বাংকার ও চারটি কূপ। এর মধ্যে একটি পাহাড়ের উপর তিনটি কূপ ও একটি কংক্রিটের বাংকার, অপর একটি পাহাড়ে একটি কূপ ও পাশের ‘টিপরা’ বস্তিতে দুইটি ঘরের নিচে দুইটি কংক্রিটের বাংকার। উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদের সবই মিলেছে দুইটি কূপ থেকে। বাংকার থেকে কিছু পাওয়া যায়নি। উদ্ধার করা গোলাবারুদের মধ্যে গতকাল বুধবার পাওয়া গেছে একটি রকেট লঞ্চার, ৪০ মিলিমিটার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৮টি রকেট, ৯৫টি রকেটের চার্জার, ৪টি মেশিনগান, ৫টি মেশিনগানের ব্যারেল আর ছোট-বড় অস্ত্রের আড়াই হাজার গুলি। এছাড়া দুইটি গুলির বেল্ট ও আগ্নেয়াস্ত্র পরিষ্কার করার ল্যান্সিড ওয়েলের ৪৬টি কৌটা উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার পাওয়া যায় ১৮৪টি রকেট ও ১৫৩টি রকেটের চার্জার। আশপাশের পাহাড়গুলোতে এখনো তল্লাশি চলছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান। ঘটনাস্থলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আশপাশের সবগুলো পাহাড়েই তল্লাশি চালানো হবে। যদিও এতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। তারপরও র্যাবের তল্লাশি চলবে। ‘ডগ স্কোয়াড’ সন্ধান দিল কূপ ও বাংকারের
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাতছড়িতে পাহাড়ের চূড়ায় তল্লাশি শুরু করেন র্যাব সদস্যরা; কিন্তু বিশাল পাহাড়ের মধ্যে কোথায় অভিযান চালানো হবে- তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত র্যাবের ‘ডগ স্কোয়াডে’র তিনটি কুকুর নিয়ে আসা হয়। তারাই কূপ ও বাংকারগুলোর সন্ধান দিয়েছে।
দুর্গম পাহাড়, পাশেই মানুষের বসবাস
র্যাব গত চারদিন ধরে তল্লাশি চালাচ্ছে চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। চুনারুঘাট উপজেলা সদর থেকে ৮/৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থান এই বাংকার ও কূপগুলোর। জাতীয় উদ্যানের প্রধান সড়ক ছেড়ে দুইটি পাহাড় পার হয়ে যেতে হয় ওই পাহাড়ে। তার মধ্যে একটি পাহাড়ের উপর ‘টিপরা’ বস্তি। পাশের পাহাড়ের উপরই পাওয়া গেছে বাংকারগুলো। ‘টিপরা’ বস্তি আসলে নামে থাকলেও এটি বস্তি নয়, উঠেছে পাকা বাড়ি। এখানে থাকেন ত্রিপুরার বাসিন্দারা। যারা অনেক আগেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন।
এই বস্তি থেকে নেমে একটা পানির ছড়া পার হলেই ওই পাহাড়। পাহাড়ের ঠিক চূড়ায় কূপ ও বাংকারগুলোর অবস্থান। ১৫ থেকে ২০ ফুটের মধ্যেই তিনটি কূপ ও একটি বাংকারের সন্ধান মিলেছে। আর পাশের আরেকটি পাহাড়ে পাওয়া গেছে একটি কূপ। আর দুইটি বাংকার পাওয়া গেছে ‘টিপরা’ বস্তিতে। যদিও ওইসব বাংকারে কিছু ছিল না। তবে এক সময় এসব বাংকারে যে কিছু থাকত তা দেখলেই বোঝা যায়। যদিও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে দুইটি মাটির কূপ থেকে। পাশেই থাকা বাংকারটিতে কিছু ছিল না। কূপের মধ্যে সোয়েটার, জ্যাকেট ও চাদরদিয়ে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুড়িয়ে রাখা ছিল। তার উপরে পলিথিন পেঁচিয়ে মাটি দেয়া হয়। এসব কূপের উপরে অনেক বড় বড় গাছও হয়েছে। তাতে বোঝা যায়- এগুলো ১০ থেকে ১২ বছর আগে রাখা। আর গোলাবারুদগুলোতে জং ধরে গেছে। উদ্ধার করা মেশিনগান ৪টি আর ব্যারেল ৫টি তো একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী।
চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক ও বগুড়ার কাহালুর গোলাবারুদের সঙ্গে মিল
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে উদ্ধার করা গোলাবারুদের সঙ্গে চট্টগ্রামে ধরা পড়া ১০ ট্রাক অস্ত্র ও বগুড়ার কাহালুতে উদ্ধার হওয়া গোলাবারুদের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান। গতকাল বুধবার সাতছড়ি উদ্যানে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই অস্ত্র গোলাবারুদ কারা এনেছে তাদের খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘থাকলেও থাকতে পারে, তদন্ত শেষ হলেই বলা যাবে।’ ব্রিফিংয়ের পর ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এই ঘটনায় চুনারুঘাট থানায় দু’টি মামলা হচ্ছে। গোলাবারুদগুলো ঢাকায় নেয়া হবে। তবে চুনারুঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অমূল্য কুমার চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, মামলা দু’টি এখনো হয়নি। প্রক্রিয়াধীন আছে। এর মধ্যে একটি বিস্ফোরক ও অপরটি অস্ত্র আইনে মামলা হবে।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ঘটনাস্থলে ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র ও বগুড়ার কাহালুর গোলাবারুদ যেভাবে দেশে এসেছে এগুলোও সেভাবেই এসেছে। তিনি বলেন, অস্ত্রের গায়ের মার্কিং দেখে বোঝা যাচ্ছে এগুলো চীনের তৈরি। তিনি বলেন, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে আমাদের দেশের পার্বত্য এলাকার সন্ত্রাসীদের কাছেও কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাবে না।
র্যাব মহাপরিচালকের ঘটনাস্থল পরিদর্শন
র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান গতকাল র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি কূপ ও বাঙ্কারগুলোর জায়গা পরিদর্শন করেন। এরপর ব্রিফিংয়েও কথা বলেন র্যাবের মহাপরিচালক। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, বিশাল বনাঞ্চল, এখানে তল্লাশী চালানো হচ্ছে। কবে নাগাদ র্যাবের তল্লাশী শেষ হবে তা বলা যাবে না। তবে আমাদের কাছে আরো কিছু তথ্য আছে। সে অনুযায়ী তল্লাশী চলছে। এখনো কেউ কেন গ্রেফতার হল না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে এখনো পাওয়া যায়নি। তবে কিছু মানুষের ব্যাপারে আমাদের কাছে তথ্য আছে, আমরা তাদের নজরদারির মধ্যে রেখেছি।
বনবিভাগ যা বলছে—
সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এই বনের মধ্যেই পাহাড়ের চূড়ায় কূপ ও বাঙ্কার খুঁড়ে পাওয়া গেল অস্ত্র ও গোলাবারুদ। বনবিভাগের সাতছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার মনির আহমেদ খান ইত্তেফাককে বলেন, এসব গোলাবারুদ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এগুলো ১০/১২ বছর আগের। আর ঐ সময় কারা দায়িত্বে ছিলেন তাও তিনি জানেন না। তিনি বলেন, জাতীয় উদ্যান ৬০০ একর জমির উপর। আর সাতছড়ি পুরো বনাঞ্চল ৩ হাজার ৭৫০ একর জমির উপর। এগুলো পাহাড়া দেয়ার দায়িত্বে আছেন মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা। ফলে কোন বন দিয়ে কারা ঘুরে বেড়াচ্ছে তা দেখা কোনভাবেই এই ৯ জনের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়।
দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে সীমান্ত, আছে কাঁটাতারের বেড়া
যে পাহাড়ের চূড়া থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে তার থেকে সীমান্ত দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। পুরো সীমান্ত এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাংলাদেশের দিকে সাতছড়ি আর ভারতের দিকে ত্রিপুরার খোয়াই মহকুমার সিদাই, মোহনপুর ও কাতলমারী সীমান্ত। এখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের আছে দু’টি বিওপি। একদিকে চিমটিবিল বিওপি এবং অন্যদিকে সাতছড়ি বিওপি। মাঝখানে পড়েছে এই এলাকাটি। সাতছড়ি বিওপির একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, সীমান্তে এখন যে ধরনের কড়াকড়ি তাতে সীমান্ত দিয়ে দেশের মধ্যে কিছু প্রবেশ করার সুযোগ নেই। তাছাড়া পুরো এলাকাটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। তিনি বলেন, সীমান্তের ওপারে বিএসএফ সদস্য সতর্ক অবস্থায় আছেন। ফলে সীমান্ত দিয়ে এসব অস্ত্র প্রবেশ করার কোন সুযোগ নেই।
