সেই আশিস দেব বর্মার বাড়ির নিচেও বাংকার

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৪, ২২:৪৯
২০০৩ সালে বগুড়ার কাহালুতে আটক ট্রাকভর্তি গোলাবারুদের চালানটি ছিল আশিস দেব বর্মার। ১১ বছর পর সেই আশিস দেব বর্মার বাড়ির নিচে বাংকারের সন্ধান পেল র্যাব। চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ির গহীন অরণ্যে তার বাড়ি। গতকাল সেখানে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে যে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য মজুদ রাখা হতো তার প্রমাণ মিলেছে। টিপরা বস্তি নামে এলাকায় পরিচিত হলেও ওখানকার ঘরগুলো ইট-সিমেন্টে তৈরি। এই আশিস দেব বর্মা ‘অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স’ (এটিটিএফ) এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ২০০৩ সাল থেকেই তিনি পলাতক। সুন্দর ও শৈল্পিকভাবে তৈরি করা এই বস্তি এলাকা ও পাশের টিলায় গতকাল পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে র্যাব সদস্যরা ৯টি বাঙ্কারের সন্ধান পায়। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং গোলা বারুদ। আশপাশের লোকজন জানান, ট্রাকভর্তি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্যের চালান আসতো আশিস দেব বর্মার কাছে। সে এসব অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য ওইসব বাঙ্কারে মজুদ রাখতো। সময়-সুযোগ বুঝে সীমান্ত দিয়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের কাছে এগুলো পাঠাতো সে। ২০০৩ সালের ২৭ জুন বগুড়ার কাহালু উপজেলার যোগারপাড়ায় ইয়াছিনের ইটের ভাটা থেকে আনারসবাহী একটি ট্রাক আটক করে পুলিশ। উপরে কিছুসংখ্যক আনারস থাকলেও ভিতরে ছিল বস্তায় বস্তায় গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য। পুলিশ ট্রাকটিতে (ঢাকা মেট্রো ট- ১১-৩৩৬৬) তল্লাশি চালিয়ে ৯৯ হাজার ৯৮৯ রাউন্ড চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও ১৭৪ কেজি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে। এ ঘটনায় কাহালু ও দুপচাঁচিয়া থানায় চারটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে থানা ও সিআইডি পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে চালানের মালিক চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ির বাসিন্দা আশিস দেব বর্মার। সে ওই ট্রাকটিরও মালিক। এ ট্রাক দিয়ে অস্ত্র, গোলবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য আনা-নেয়া হতো বলে তদন্তে তার প্রমাণ মিলে। ঘটনার পর আশিস দেব বর্মা পলাতক থাকে। আজও তার সন্ধান পায়নি পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এমনকি চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটিও আশিস দেব বর্মার সাতছড়ির ঘাঁটিতে যাওয়ার কথা ছিল। এমন তথ্য তদন্তে বের হয়ে আসে। গতকাল র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান এবং লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান সাতছড়ির গহীন অরণ্যে উদ্ধারকৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বাঙ্কারসমূহ পরিদর্শনে যান। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সাল থেকে ভারতের ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা), ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (এনএলএফটি) এবং এটিটিএফ’র নেতাদের ছিল বাংলাদেশে অবাধ যাতায়াত। কুড়িগ্রাম, শেরপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতের এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের বেশকিছু সংখ্যক ঘাঁটি ছিল। এসব ঘাঁটিতে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য আসতো। গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিষয়টি জানতেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা ওইসব কর্মকর্তার সঙ্গে গলফ খেলতেন। একত্রে রাতের খাবার খেয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও একত্রে যেতেন। অভিযোগ আছে, তাদের নিরাপত্তায় র্যাব পুলিশকেও ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব প্রতিষ্ঠার পর ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের নিরাপত্তার কাজেও র্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে কথা শোনা যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি বন্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং তাদের অবাধ যাতায়াতের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থান নেয়। বগুড়ার কাহালুতে ট্রাক ভর্তি গোলাবারুদ উদ্ধারের পর আলোচনায় আসে চুনারুঘাটের সাতছড়ির পাহাড়ের উপর বাস করা ত্রিপুরার বর্মা গোষ্ঠীর ‘টিপরা’ বস্তি। কারণ ওই গোলাবারুদের ট্রাকটি গিয়েছিল এখান থেকেই। আশিস দেব বর্মা ছিল ট্রাকের মালিক। তিনিই গুলিভর্তি করে ট্রাকটি পাঠিয়েছিলেন। ওই সময় এই এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এই বস্তির ১৮ জনকে তখন গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের অনেকেই এখনো কারাগারে। অরণ্যে বসবাসকারীরা পাহাড় ও চা বাগানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে সমপ্রতি তাদের অনেকেই সচ্ছল হয়েছেন। করেছেন পাকা ঘরবাড়ি। পাকিস্তান আমলের আগ থেকেই ত্রিপুরার বাসিন্দাদের ২২টি পরিবার এখানে বাস করতো। তা এখন বেড়ে ৪০ পরিবারের মতো হয়ে গেছে। আশিসের মা খেমতি দেব বর্মার সঙ্গে গতকাল সকালে কথা হয় তার বাড়িতেই। তিনি বলেন, তিন ছেলের মধ্যে আশিস সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে তার আর খোঁজ নেই। অন্য দুই ছেলে চা বাগানে কাজ করে। আশিসের ঘরের মধ্যে পাওয়া গেছে এটিটিএফ’র কিছু কাগজপত্র। কাগজপত্রগুলো অনেকদিন আগের। ঘরটিতে কেউ বসবাস করতো না তা ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়। ঘরটির পুরো ফ্লোরের নিচেই একটি বাংকার। বাইরে থেকে প্রবেশের জন্য আছে ব্যবস্থা। গতকাল সকালেই এই বাংকারটি আবিষ্কার করে র্যাব সদস্যরা। টিপরা বস্তির বাসিন্দা কালি দেব বর্মা বলেন, ‘আগে ত্রিপুরা থেকে অনেকেই এখানে এসে যোগাযোগ করত। অনেক টাকা-পয়সাও দিত। গত ১০/১২ বছরে কেউ আর আসে না।’ তিনি বলেন, আমার এক ছেলে বিজিবিতে চাকরি করে। সে গত দুই দিন আগে বাড়ি এসেছে। এখন তাকে নিয়ে কোন ঝামেলা হয় কি-না তা নিয়েই চিন্তা আছি। সুনীল বর্মা নামের একজন চা শ্রমিক বললেন, ‘অনেকদিন আগে ত্রিপুরার ওরা আসত। রাতে থাকতও। কিন্তু এখন আর তাদের কেউ আসে না।’