বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের উচ্চতা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্যেই পৃথিবীর অন্য সকল দেশের মত বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘হতে হবে সোচ্চার, সাগরের উচ্চতা বাড়াবো না আর।’
নানা কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবেশের ঝুঁকিকে এখন সর্বোচ্চ মাত্রায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মানুষ তার প্রয়োজনেই শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছাচ্ছে। শিল্পবর্জ্য পৃথিবীর বুকে ঘটিয়ে চলেছে নানাবিধ বিপর্যয়। উন্নত বিশ্বের মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কুফল ভোগ করছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। সবুজ প্রকৃতি কমে গিয়ে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি ওজোন স্তরে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি মানুষের বসতিকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব কারণেই বিশ্বে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রতি বছরই পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারো একই রকম গুরুত্ব সহকারে দিবসটি পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘসহ সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলো দিনটিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মনুষ্য সৃষ্ট কারণে আবহাওয়ায় পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়বে জীবন এবং পরিবেশের ওপর। বিশ্বের কোনো অঞ্চলই বাদ পড়বে না এ বিপর্যয় থেকে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ কেলি লেভিন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় খবর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রভাব হবে ব্যাপক বিস্তৃত।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনগুলোতে আশঙ্কা তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া যেমন বাড়বে তেমনি বাড়বে খাদ্য ও পানির সংকট এবং পরিবেশের ভারসাম্য। মৃত্যু ঘটবে জলজ প্রাণীর, ধ্বংস হবে বনাঞ্চল। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকুলীয় বন্যা, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঘটবে। এই শতাব্দীর শেষভাগে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এতে আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বন্যার প্রাদুর্ভাব বাড়বে। এছাড়া উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় প্রচণ্ড তপ্ত আবহাওয়া বিরাজ করবে। উত্তপ্ত বিশ্বে টিকে থাকতে সবচেয়ে বেগ পেতে হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। লেভিন বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হবে।
বাংলাদেশ নিয়েও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের শেষ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর যে সমতল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশংকা করা হয়, তার মধ্যে বাংলাদেশ আর মালদ্বীপ অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, গত শতাব্দীতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৮ আর ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ভেতরে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, এই হারে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর গড়ে ৩ দশমিক ২ মিমি করে বাড়ছে।
বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২১০০ সাল নাগাদ যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন হেক্টর জমি প্লাবিত হতে পারে| সম্প্রতি সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের পানি পরিমাপ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে| তাদেরও আশঙ্কা, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ৪৫ জনের মধ্যে ১ জন জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে| আর বাংলাদেশে সংখ্যাটা হবে প্রতি সাতজনে একজন| দেশের ১৭ ভাগ এলাকা বিলীন হয়ে যাবে সমুদ্র গর্ভে| ইতিমধ্যে কুতুবদিয়া এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ মূল ভূখণ্ড ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। সমপ্রতি বৃটিশ গণমাধ্যম প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপদ থেকে বাংলাদেশের বাঁচার একমাত্র পথ অভিবাসন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৬০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারেরও কম উচ্চতাসম্পন্ন এবং তা কোন না কোনভাবে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত হুমকির মুখে রয়েছে।
এদিকে সরকার সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাসহ নানা কার্যক্রম গ্রহণ করছে। সরকার ‘ন্যাশনাল এডাপটেশন প্রোগ্রাম অব একশন ( এনএটিপি)’ প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় ১৮টি অগ্রাধিকারমূলক অভিযোজন কার্যক্রম (প্রকল্প) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘ন্যাশনাল এডাপটেশন প্ল্যান (এনএপি)’ প্রণয়নের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের কাজ চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব মোকাবেলায় জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনায় ৬টি এলাকায় ৪৪টি কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ দ্বারা অভিযোজন ও প্রশমনমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চলছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী: দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বিশ্ববাসীর জন্য স্থায়ী উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম বিধায় আমাদের উত্কণ্ঠা সর্বাধিক। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে বিশ্ব জনমত সৃষ্টির জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের সকল নাগরিককে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণীতে বলেন, বিজ্ঞানীরা এ শতাব্দীতে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে মাত্রায় বৃদ্ধি হবে বলে ধারণা করেছিল, বাস্তবে এ উচ্চতা বৃদ্ধির হার আরও বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের দিক দিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে দেশের সকল নাগরিককে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
কর্মসূচি:দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৪ উদযাপন এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৪ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগদান করবেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। অনুষ্ঠানে পরিবেশ বিষয়ে অবদানের জন্য বিগত বছরের মতো এ বছরও বিভিন্ন ব্যক্তি/সংস্থাকে জাতীয় পরিবেশ পদক প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে আলোচনা অনুষ্ঠান প্রচার করবে। অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং প্রধান বন সংরক্ষক অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ঢাকা মহানগরীর ১০০টি মাধ্যমিক স্কুলে আজ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা:এদিকে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধ ও পরিবেশ রক্ষার আহ্বান জানিয়ে গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে ওসমানী মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিকুর রহমান পাটোয়ারী বেলুন উড়িয়ে শোভাযাত্রাটি উদ্বোধন করেন।
এছাড়া গতকাল বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘নদীর দ্বীপ চর : প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষয় ও জীবনযাত্রা’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’র উপাচার্য অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ এর সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল বাকী।
