সীমান্তে ফের মিয়ানমারের গুলি, মর্টার শেল

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৪, ২২:৫১
বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমানের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারো নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের পর্দানঝিরি ও জামছড়িতে গুলি ও মর্টারশেল নিক্ষেপ করেছে মিয়ানমারের সীমান্ত বাহিনী (বিজিপি)। গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০ টার দিকে হঠাত্ গুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু হলে এলাকার লোকজন আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। পরে প্রশাসনের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে কিছু লোক বাড়ি ফিরেছে বলে জানা গেছে। গুলির ব্যাপারে স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন (৩২) জানান, রাত পৌনে ১০ টার দিকে বাজারের দিকে যাওয়ার সময় পানছড়ির ৪৫ ও ৪৬ নম্বর পিলারের ওপার থেকে গোলাবর্ষণের আওয়াজ শুনতে পেয়ে তিনি দ্রুত ব্রিজের নিচে আশ্রয় নেয়। ঐ এলাকার ইউপি সদস্য আলী হোসেন জানান, আমি নিজেও আতঙ্কিত, আমার আশেপাশের এলাকাবাসীকে নিরাপদে সরে যেতে বলেছি এবং বিষয়টি প্রশাসনকেও জানিয়েছি। ঘটনার পরপর বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিজিবির ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিকুর রহমান জানান, সীমান্তের মিয়ানমার অংশে গোলবর্ষণের আওয়াজ শোনা গেছে। এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরেও দৌছড়ি সীমান্তের ৫২ নম্বর পিলার এলাকায় বিজিপি ৫-৬ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে বলে এলাকার একটি সূত্র দাবি করেছে। গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু শাফায়েত মো.সাহেদুল ইসলাম ও লে. কর্নেল শফিকুর রহমান। আবু শাফায়েত মো. সাহেদুল ইসলাম জানান, বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যারা আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছিল, তাদেরকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, বিজিপি ও বাংলাদেশ সীমান্তের রোহিঙ্গা বিছিন্নতাবাদী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গে মঙ্গলবার রাতে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। যদিও এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে, সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। আসারতলী বিওপির ইনচার্জ মেজর আফজাল বলেন, বিজিবির টহল আগের চেয়ে আরো বাড়ানো হয়েছে। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত আমরা। বিজিবি-বিজিপি বৈঠক বসছে আজ কক্সবাজার প্রতিনিধি আহমেদ গিয়াস জানান, গত মাসের ৮ তারিখে কক্সবাজার শহরে বিজিবি-বিজিপির সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান এবং মিয়ানমারের পক্ষে ছিলেন মংডুস্থ ইমিগ্রেশন হেডকোয়াটার্সের পরিচালক কর্নেল থিং কু কু। বৈঠকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য বাংলাদেশে ‘আশ্রয়প্রাপ্ত’ সন্ত্রাসীদের দায়ী করে বিজিপি। এসময় তারা কথিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করতে দেয়ারও দাবি জানায়। বিজিবি মিয়ানমারের অভিযোগ নাকচ করে দেয়। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অভিযান চালালে বিজিপিকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতেও অস্বীকার করে বিজিবি। এই পতাকা বৈঠকের পর বাংলাদেশ সীমান্তে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যাপক হারে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে শুরু করে মিয়ানমার। সীমান্তের ২৭ নম্বর পিলার থেকে ৫২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী এলাকার বিভিন্ন ক্যাম্পে অন্তত ৮ হাজার ৫শ’ সৈন্য সমাবেশ ঘটায় বলে সীমান্তের বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। এসময় বিজিবি আবারও পতাকা বৈঠকের আমন্ত্রণ জানায় বিজিপিকে। কিন্তু বিজিবির এ আমন্ত্রণে কোন সাড়া না দিয়ে টানা বেশ কয়েকদিন নির্লিপ্ত থাকে বিজিপি। এদিকে জবাবের অপেক্ষায় থাকা বিজিবির ৩১ ব্যাটালিয়নের একদল সদস্য সাদা পতাকা নিয়ে গত ২৮ মে নাইক্ষ্যংছড়ির পানছড়ি সীমান্তে গেলে তাদের উপর আকস্মিকভাবে গুলি চালায় বিজিপি। এতে বিজিবির মিজানুর রহমান নিহত হন এবং আরো ৪ জন গুরুতর আহত হয়। এই অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার সকালে মিয়ানমারের মংডুতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিজিবি-বিজিপি সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠক। বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন কক্সবাজার অঞ্চলের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান। তিনি জানান, সীমান্তে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক আচরণ অন্যায় ও অযৌক্তিক। আজ অনুষ্ঠেয় বৈঠকে বিজিবি সদস্য হত্যার প্রতিবাদসহ তাদের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক ও উস্কানিমূলক আচরণের আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাব। মিয়ানমারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোন বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করে তত্পরতা চালানোর সুযোগ আমরা কাউকে দেই না। এবিষয়ে বিজিপির কাছে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা আমাদের কাছে তারা দিতে পারে। কিন্তু বিদেশি কোন বাহিনীকে আমরা বেআইনীভাবে বাংলাদেশ ভূ-খণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারি না। বিজিবি দক্ষিণ-পূর্ব রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহম্মদ আলী বলেন, মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোন আস্তানা গড়ে তোলার সুযোগ আমরা দেই না। ভবিষ্যতেও দেয়া হবে না। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই। কিন্তু তাদের উস্কানিমূলক কোন আচরণে আমরা নির্লিপ্ত থাকতে পারি না।